প্রিয় ঝিনাইদহ
ভারতীয় নিম্নমানের বীজে সর্ব/স্বান্ত ঝিনাইদহের শত শত প্রান্তিক চাষি
উচ্চকন্ঠ 24-May-2026 50
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ঝিনাইদহের শৈলকুপায় এবার দেখা দিয়েছে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয়। মাঠভরা ফলন হলেও বাজারে বিক্রি তো দূরের কথা, ঘরে তুলেই পচে যাচ্ছে হাজার হাজার মন পেঁয়াজ। সংরক্ষণ অযোগ্য ভারতীয় নিম্নমানের “নাসিক” জাতের বীজে প্রতারিত হয়ে শত শত প্রান্তিক কৃষক এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। বাধ্য হয়ে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ ডোবা-নালা, খাল-বিল ও পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে পচা পেঁয়াজের দুর্গন্ধ, আর কৃষক পরিবারগুলোতে বইছে হতাশা আর হাহাকার।
সরেজমিনে শৈলকুপার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের বাড়ির উঠান, মাচা ও গোডাউনে স্তূপ করে রাখা বড় আকারের উজ্জ্বল লালচে পেঁয়াজে দ্রুত পচন ধরছে। গৃহবধূরা প্রতিদিন ঝুড়ি ও বস্তা ভর্তি পচা পেঁয়াজ বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও পুরো খাল ভরে গেছে পচা পেঁয়াজে। কৃষকের বহু কষ্টের ফসল এভাবে নষ্ট হতে দেখে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া।
কৃষকদের অভিযোগ, মেহেরপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কিছু অসাধু বীজ ব্যবসায়ী ও ডিলার শৈলকুপায় নিম্নমানের ভারতীয় বীজ এনে “সুখসাগর”, “লালতীর কিং” বা উন্নত দেশীয় জাতের নামে বিক্রি করেছেন। কৃষকরা উচ্চমূল্যে সেই বীজ কিনে চাষ করলেও জমিতে হয়েছে ভারতীয় “নাসিক” জাতের পেঁয়াজ, যা দ্রুত পচনশীল এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না।
শৈলকুপার বিপ্রবগদিয়া গ্রামের কৃষক এনায়েত হোসেন জানান, তিনি ভাই ভাই বীজ ভা-ার থেকে “মহারাজ” ও “লালতীর” জাতের ৭ কেজি বীজ কিনেছিলেন। মহারাজ বীজের কেজি ছিল ৬ হাজার ৫শ টাকা এবং লালতীরের দাম ছিল ১৩ হাজার ৭শ টাকা। ডিলার তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন ভালো ফলন ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের কথা। কিন্তু ফলন ভালো হলেও ঘরে তোলার পর থেকেই পেঁয়াজে পচন শুরু হয়। বিশেষ করে বড় আকারের পেঁয়াজগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
মনোহরপুর গ্রামের কৃষক রাজন দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। তিনি লাকি বীজ ভা-ার থেকে প্রায় ৯ হাজার টাকা কেজি দরে সুখসাগর জাতের বীজ কিনেছিলেন। কিন্তু পরে দেখেন জমিতে হয়েছে নাসিক জাতের পেঁয়াজ। ফলন ভালো হলেও বাড়িতে তোলার তিন-চার দিনের মধ্যেই পচতে শুরু করে। তার বাড়িতে ২শ মনের বেশি পেঁয়াজের বেশিরভাগই খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একই গ্রামের একটি পরিবারের চার কৃষক ৬শ মনেরও বেশি পেঁয়াজ পানিতে ফেলেছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার ধলহরাচন্দ্র, হুদাকুশবাড়িয়া, মাঝদিয়া, আড়–য়াপাড়া ও ডাউটিয়া গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায়। কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি দেড়শ মন পেঁয়াজ ডোবায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক কৃষক বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে গেলেও পাইকার ও ব্যবসায়ীরা তা কিনছেন না। ফলে ক্ষোভে অনেকে বাজারেই পেঁয়াজ ফেলে খালি বস্তা হাতে বাড়ি ফিরছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর অরণ্য বলেন, “সুখসাগর বা দেশীয় জাত ছাড়া নাসিক জাতের পেঁয়াজ কেউ কিনছে না। এগুলো সংরক্ষণ করা যায় না, দ্রুত পচে যায়। কৃষকরা এখন চরম বিপদে।”
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ। তবে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জমিতে উৎপাদিত হয়েছে নিম্নমানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ।
কৃষকদের অভিযোগ, চাষ মৌসুমের শুরুতেই তারা সার ও কীটনাশক সংকটে পড়েন। সরকার নির্ধারিত ভর্তুকির ডিএপি সার বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হয়। ১ হাজার টাকার সার কিনতে হয়েছে ২ হাজার টাকার বেশি দামে। এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তার ওপর নিম্নমানের বীজের কারণে এখন পুরো বিনিয়োগই লোকসানে পরিণত হয়েছে। কৃষকদের দাবি, বিঘাপ্রতি এবার ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন কৃষক কৃষি অফিসে অভিযোগ দিলে তদন্তের পর কিছু ডিলারের কাছ থেকে বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। মাঝদিয়া গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন জানান, কৃষি অফিসের সহায়তায় তিনি বীজের মূল্য ফেরত পেয়েছেন। একইভাবে লাল্টু মোল্লা, রাম ম-ল, রহিতোষ সরকারসহ অন্তত ১৫ জন কৃষক টাকা ফেরত পেয়েছেন।
তবে অভিযুক্ত বীজ ব্যবসায়ীরা নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন। ভাই ভাই বীজ ভা-ারের মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, “বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল দুই মাস পর্যন্ত পেঁয়াজে পচন ধরবে না। কৃষকরা জেনেশুনেই বীজ কিনেছেন। অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত বড় হওয়ার কারণেও পেঁয়াজ পচছে।”
একই বক্তব্য দেন লাকি বীজ ভা-ারের মালিক মোস্তাক হোসেন। তিনি দাবি করেন, “কৃষকেরা যে বীজ চেয়েছে সেটাই দেওয়া হয়েছে। খারাপ বীজ বিক্রি করা হয়নি। এবারের বৃষ্টি ও অতিরিক্ত বড় আকারের কারণেই পচন ধরেছে।”
তবে কৃষকেরা এসব বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, অধিক লাভের আশায় পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের ভারতীয় বীজ বাজারজাত করা হয়েছে। এতে হাজার হাজার কৃষক আর্থিকভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছেন।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান খান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন কৃষককে বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আরও আবেদন এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, অতিমাত্রায় সার প্রয়োগ এবং পেঁয়াজ তোলার আগে বৃষ্টির কারণেও পচন বৃদ্ধি পেয়েছে।
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা লিখিত অভিযোগ দিলে অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাজারে দেশীয় ভালো জাতের পেঁয়াজ ৮শ থেকে ৯শ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পেঁয়াজ কেউ কিনছে না। ফলে কৃষকদের চোখে এখন শুধুই হতাশা। অনেকেই বলছেন, ঋণ করে চাষ করেছিলেন, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ গরু-ছাগল বিক্রির চিন্তা করছেন, আবার কেউ ভাবছেন আগামী মৌসুমে আর চাষই করবেন না।
ঝিনাইদহের শৈলকুপার এই ভয়াবহ চিত্র এখন কৃষি ব্যবস্থাপনা, বীজ বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষক সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
office@ukantho.com