প্রিয় ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জের এক সংগ্রামী নাম শহীদুল ইসলাম
উচ্চকন্ঠ 12-Apr-2026 85
রেজাউল ইসলামঃ
কালীগঞ্জের এক সংগ্রামী নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নেতা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম। গত ২২ ফেব্রুয়ারী তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। শহীদুল ইসলাম ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারী ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ফয়লা গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়ি একই উপজেলার বলরামপুর গ্রামে। পিতার নাম মরহুম শামছুল ইসলাম। তার পিতা প্রথমে ঢাকা ফরেণ পোস্ট অফিসের করণিক ও পরবর্তীতে খুলনা ফরেণ পোস্ট অফিসের ইনচার্জ অফিসার ছিলেন। মাতা মরহুমা ফাতেমা খাতুন গৃহীনি। দাদা মরহুম সদরউদ্দিন আহমেদ নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুলের শিক্ষক ও একবার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) ছিলেন। নানা মরহুম মুন্সী খলিলুর রহমান কালীগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
পিতার চাকুরিসুত্রে শহীদুল ইসলাম ঢাকা গেন্ডারিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন । ঢাকা জেএল জুবলী হাইস্কুলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ( ইংলিশ মিডিয়ামে ) লেখা পড়া করেন। তিনি ৭ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে ঢাকা উত্তাল হয়ে উঠলে ছেলেকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন, ছেলের লেখাপড়া ও নিশ্চিত জীবনের কথা চিন্তা করে তার পিতা পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
শহীদুল ইসলাম গ্রামে ফিরে কালীগঞ্জ নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুলে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং নানা বাড়ি ফয়লায় থেকে লেখাপড়া করতে থাকেন। এখানেও তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৭০ সালে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হলে তিনি বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের কালীগঞ্জ থানা শাখার আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।১৯৬৯ ও ৭০ এর ছাত্র -গণ আন্দোলনে তিনি কালীগঞ্জে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুক্তিসংগ্রামের ডাক দিলে তিনি ভারতে গমন করেন। " বিশ্ব বিবেক জাগরণ" পদযাত্রা দলের সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।
দেশ স্বাধীন হলে বাড়ি ফিরে আসেন। আবারো লেখা-পড়া ও ছাত্র রাজনীতিতে মনোযোগ দেন। ১৯৭২ সালে দ্বিতীয় ব্যাচে এসএসসি পাস করেন। এসএসসি পরীক্ষার আগে তার পিতা তাকে ভালো প্যান্টশার্ট বানানোর জন্য কিছু টাকা পাঠালেও তিনি তা না বানিয়ে সে টাকা দিয়ে দুজন গরীব ছাত্রের এসএসসি পরীক্ষার ফিস দিয়ে দেন। ফিস দিতে না পারায় এ দুজনের পরীক্ষা দেয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শহীদুল এসএসসি পাস করে কালীগঞ্জ মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০/৭১ সালে তার অনেক সহকর্মী গোপন নকশাল আন্দোলনে যোগ দিলেও তিনি সে পথে যাননি। তিনি কালীগঞ্জ শহরে থেকে ছাত্র রাজনীতি করেছেন। তারপরও তাকে নকশাল আখ্যা দিয়ে ১৯৭৪ সালে তার ইন্টার পরীক্ষার কিছুদিন আগে তার পিতার গ্রামের বাড়ি বিডিআর বাহিনী ভেঙ্গে দেয়। বাড়ি ভাঙ্গার কারণ জানতে তিনি থানায় গেলে তাকে গ্রেফতার করে ঝিনাইদহ কারা হাজতে পাঠানো হয়। ১ মাস পর তিনি জামিন পান। সেবার তার এইচএসসি পরীক্ষা দেয়া হয়নি।
১৯৭৫ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। এবং এ বছরই তিনি ঢাকা ফরেণ পোস্ট অফিসে করণিক পদে চাকুরী নেন। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। চাকুরী থেকে ইস্তেফা দেন। আবারো পুরোদমে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে থেকে ১৯৮০ সালে তিনি বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে সভাপতি হন। ১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারী করলে ১৪টি ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তাতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সম্মুখভাগে থেকে এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৬ সালে বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন একিভুত হয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন নাম ধারণ করলে তিনি তার কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ৮৭ ছাত্র সম্মেলনে তিনি ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন পরবর্তীতে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাথে একিভুত হয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী নাম ধারণ করে। ছাত্র রাজনীতিতে থাকাকালীন তিনি এশিয়া মহাদেশ ছাত্র সমিতির সদস্য ছিলেন। এবং ১৯৮৪ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত এশিয়া ছাত্র সমিতির সম্মেলনে যোগদান করেন। ছাত্র নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় তিনি সংগঠনের অনেক সংকলন সম্পাদনা ও প্রকাশনা করেন। এতে তার লেখালেখির হাত গড়ে উঠে।
ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য হন। ( ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় শহীদুল ইসলাম ও তৎকালীন ডাকসু জিএস জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন বাবলুকে আলোচনার জন্য ক্ষমতাসীন এরশাদ ডাকেন। শহীদুল ইসলাম আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও জিয়াউদ্দিন বাবলু আলোচনায় যান। এর কিছুদিন পর জিয়াউদ্দিন বাবলু প্রথমে এরশাদের ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও পরে উপমন্ত্রী এবং পূর্ণমন্ত্রী হন। )
১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ফেডারেশনের সম্মেলনে শহীদুল পাকিস্তান সফর করেন। একই বছরের কংগ্রেসে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য পদ থেকে বিদায় নেন।
সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেন।
১৯৯২ সালে ইনকিলাব গ্রুপের দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন। দুই বছর পর কতৃপক্ষ পত্রিকাটি বন্ধ ঘোষণা করলে তিনি দি নিউ নেশন পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে জয়েন্ট করেন। এরপর দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা বের হলে তিনি শুরু থেকেই সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে অনেক দিন কাজ করেন। পরে বাংলাদেশ টুডে, নিউজ টুডে, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষে তিনি আবারো দি নিউ নেশনে ফিরে আসেন। এবং চীফ রিপোর্টার হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শরীর আর সাংবাদিকতার জন্য ফিট হয়নি। কয়েক বছর ঢাকায় চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়িতে থেকে তিনি ঢাকার চিকিৎসকের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারীর দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপকের চিকিৎসামতে বড় বোনের বাড়িতে তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসা চলাকালীন তিনি ব্রেন স্ট্রোক করেন। ২১ ফেব্রুয়ারী তাকে যশোর কুইন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী তিনি এ হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেখা শুনা করতেন। ফলে সাংবাদিক হিসেবে ও গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি জার্মান, চীন ,ফ্রান্স, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপ, ভারত, রাশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩০/৩৫ টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। শহীদুল ইসলাম চির অবিবাহিত ছিলেন। তিনি কর্মজীবনে অনেক বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানুষকে আর্থিক সহায়তা করেছেন। নিজের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেন নি ।
লেখক
কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সদস্য
office@ukantho.com