প্রিয় ঝিনাইদহ
বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী সাদিয়ার রং তুলির আচড়ে ফুটে ওঠে জীবন্ত সব ছবি
উচ্চকন্ঠ 18-Mar-2025 36
হুমায়ুন কবির, নিজস্ব প্রতিবেদক, কালীগঞ্জ: আবু সাঈদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের দৃশ্য, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম জয়নাল আবেদীন, গ্রামীণ জীবন,নদীর দৃশ্য, গ্রামের মেঠোপথ, সারি সারি গাছ, কৃষকের ঘরসহ গ্রামবাংলার নানা আবহ ফুটে উঠেছে চিত্রকর্মে। এগুলো এঁকেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরী সাদিয়া সুলতানা
। জগতের কোন শব্দ এমনকি জন্মদাতা পিতা-মাতার মায়া ভরা ডাক কিছুই শুনতে পান না সাদিয়া সুলতানা। মাত্র ১১ বছর বয়সের এই কিশোরী পিতা মাতা ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধবী কারো সাথেই বলতে পারেন না প্রয়োজনীয় কিংবা মনের যেকোনো কথা। তাতে কি হয়েছে মনের ক্যানভাসে জড়ো হওয়া সব শব্দগুচ্ছ রং তুলির আঁচড়ে কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তুলছেন অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী সাদিয়া সুলতানা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই কিশোরী কালীগঞ্জ উপজেলার মধুগঞ্জ বাজারের বনানী পাড়ার বাসিন্দা মশিউর রহমান ও শাহনাজ পারভিন দম্পতির প্রথম সন্তান। জন্মের দু'বছর অতিবাহিত হলেও যখন স্বাভাবিকভাবে সাদিয়া কথা বলতে এবং শুনতে না পায় তখন তার বাবা মা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর ডাক্তার নিশ্চিত করেন সাদিয়া কানে শুনতে কিংবা কথা বলতে পারবে না। এরপর ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের স্কুলে নিয়মিত থেরাপি দেওয়ার সময় সেখানে থাকা ছবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত সে। বাড়িতে এসে কলম দিয়েই বিভিন্ন দৃশ্যের ছবি আঁকতে শুরু করে।মেয়ের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ দেখে বাবা তাকে রং তুলি ও কাগজ কিনে দেয়। এভাবেই ছবি আঁকার হাতে খড়ি হয় বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী সাদিয়ার। যেকোনো ছবি দেখে হুবহু এঁকে দিতে পারে সাদিয়া।মাত্র ছয় বছর বয়সেই ঢাকা শিশু একাডেমিতে এক প্রতিযোগিতায় চিত্রাংকনে প্রথম স্থান অধিকার করে পুরস্কার লাভ করে।বর্তমানে সে ঝিনাইদহ শিল্পকলা একাডেমীতে চিত্রাংকন শ্রেণীর নিয়মিত ছাত্রী। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় সাদিয়া অংশগ্রহণ করে অর্জন করেছে নানা পুরস্কার। ছবি আঁকার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই কিশোরী লেখাপড়ায় বরাবরই ভালো ফলাফল করে আসছে। পরিবার ও কাছের কিছু আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করার প্রচেষ্টায় সর্বদা এগিয়ে যাচ্ছে সে। শহরের সলিমুননেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া প্রতিবন্ধী সাদিয়া সুলতানার সহপাঠী সিথি হক, আনিকা আয়শা ও সুমনা আক্তার তুরানী এই প্রতিবেদককে জানাই, সাদিয়া আমাদের খুব ভালো একজন বন্ধু। আমাদের মত ও স্বাভাবিকভাবে শুনতে এবং কথা বলতে না পারলেও তার সাথে আমাদের ভাবের আদান-প্রদানে কোন সমস্যা হয় না। আমরা ইশারা ইঙ্গিতে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালায়। ও লেখাপড়ার পাশাপাশি খুব ভালো ছবি আঁকে। ওর আঁকা ছবি দেখে আমরা মুগ্ধ হই। ছবি একেঁই ও একদিন সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।ঝিনাইদহ শিল্পকলা একাডেমীর শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সাদিয়া খুব মেধাবী। ওর ছবি আঁকার আগ্রহ, কাজের প্রতি ভালোবাসা এবং একাগ্রতা দেখে আমার মনে হয়েছে সে চিত্রাঙ্কনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে । আমার এখানে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বেশ কয়েকজন রয়েছে তার মধ্যে সাদিয়া অন্যতম। আমি বিশ্বাস করি ওর প্রবল ইচ্ছা শক্তি ওকে সাফল্য চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিবে। সাদিয়া সুলতানার কাকী সোনিয়া বেগম বলেন, আমার দেবরের একমাত্র মেয়ে সাদিয়া। আল্লাহ তার কানে শুনতে পাওয়া এবং কথা বলার শক্তি না দিলেও তার মধ্যে যে বিশেষ প্রতিভা দান করেছেন তার জন্য আমরা আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞ। আল্লাহ সহায় থাকলে ছবি এঁকেই আমাদের মেয়ে একদিন সেরাদের তালিকায় নাম লেখাবে।
বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী কিশোরী সাদিয়া সুলতানার মমতাময়ী মা শাহনাজ পারভীন আবেগাপ্লুতভাবে বলেন,আমার মেয়ে কথা বলতে না পারার কারণে অনেকেই তার সাথে মেশে না,তাকে এড়িয়ে চলে। পরিচিত জনদের নিকট থেকে এমন আচরণ পেয়ে সে বাড়িতে এসে অনেক কান্না করে। আমারও খারাপ লাগে। আমার মেয়ে অনেক শান্ত।নিজের সব কাজ সে সুন্দর মত দায়িত্ব নিয়ে করে। আর ছবি আঁকার প্রতি তার খুব আগ্রহ। সে ছবি আঁকা শিখতে চাই এবং দেশের বাইরে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার প্রবল ইচ্ছার কথাও সে আমাকে জানিয়েছে। সে তার স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করে যাচ্ছে ভালো কিছু করার। আপনারা আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন। আমিও তার বাবা সার্বক্ষণিক তাকে লেখাপড়া ও ছবি আঁকার ব্যাপারে সহায়তা করে যাচ্ছি।তার ছবি আঁকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীতা যেন প্রতিবন্ধকতা না হয় সেটিই আমাদের সকলের কাম্য।
office@ukantho.com