প্রিয় ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ১০ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, বেপরোয়া বাস ও অবৈধ পার্কিংয়ে আতঙ্ক
উচ্চকন্ঠ 26-Oct-2026 19
পৌর এলাকায় প্রবেশে নেয় গতিসীমা
গড়াই, রূপসা ও শাপলা পরিবহনের বেপরোয়া গতি
মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং বন্ধ
পৌর এলাকায় গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদাসীনতা
হুমায়ুন কবির, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মধ্যে ঝিনাইদহ–যশোর ও কালীগঞ্জ–কোটচাঁদপুর মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে বেপরোয়া গতিতে যাত্রীবাহী বাস পণ্যবাহী যান চলাচল এবং সড়কের উপর এবং পাশে অবৈধভাবে যানবাহন পার্কিংয়ের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও ছোট যানবাহনের চালকদের।
পৌরবাসীর অভিযোগ, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের অতিরিক্ত গতি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
জানা যায়, কালীগঞ্জ পৌরসভার মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহ–যশোর মহাসড়কের প্রায় ৬ কিলোমিটার এবং কালীগঞ্জ–কোটচাঁদপুর মহাসড়কের প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশ রয়েছে। সব মিলিয়ে পৌর এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার মহাসড়কে প্রতিদিন অসংখ্য দূরপাল্লা এবং আ:ন্ত যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, কুষ্টিয়া ও খুলনা রুটে গড়াই ও রূপসা পরিবহন এবং যশোর থেকে হাসাদাগামী শাপলা পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস কালীগঞ্জ পৌর এলাকায় প্রবেশের পরও উচ্চগতিতে চলাচল করে। বিশেষ করে জনবহুল ও ব্যস্ত সড়কে এসব বাসের বেপরোয়া চলাচলে ছোট যানবাহনের চালক ও পথচারীদের মধ্যে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে,অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে।
পৌর এলাকার মধ্যে মহাসড়ক ব্যবহারকারী ছোটো যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, পৌর এলাকার মধ্যে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলেও দূরপাল্লার বাসচালকরা তা মানছেন না। অনেক সময় বাসের দ্রুতগতির কারণে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনের চালকদের বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়।
অন্যদিকে, মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে যানবাহন পার্কিং করায় সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) প্রণীত ‘মোটরযানের গতিসীমা সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০২৪’-এ সড়ক ও মহাসড়কের শ্রেণি এবং যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৪৪ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ১২৫-এর উপবিধি ৪ অনুযায়ী এ নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়।
মোটরযানের গতিসীসা সংক্রান্ত গতিসীমার অনুযায়ী পৌর এলাকার মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটর কার, জিপ, মাইক্রোবাস ইত্যাদি হালকা যাত্রীবাহী মোটরযানের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার হবে। বাস, মিনিবাস ইত্যাদির মধ্যে ভারী যাত্রীবাহী মোটরযানের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার হবে। ট্রাক, মিনিট্রাক, কাভারভ্যান ইত্যাদি মালবাহী মোটর যানের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘন্টায় ৩০ কিলোমিটার হবে। মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘন্টায় ৩০ কিলোমিটার হবে। থ্রী হুইলারের সর্বোচ্চগতিসীমা হবে চলাচলের অনুমতি সাপেক্ষে ঘন্টায় ৩০ কিলোমিটার। সরকারিভাবে নির্ধারিত এ গতিসীমাকে বৃদ্ধাঙালী দেখিয়ে কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মধ্যে থাকা মহাসডক চালকরা ইচ্ছামত গতিতে ব্যবহার করছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত ছোট বড় প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি রূপসা পরিবহনের বেপরোয়া গতির কারণে ঘটা দুর্ঘটনায় আব্দুস সামাদ নামের একজন মোটরসাইকেল আরহীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে একদিকে যেমন সবধরণের যানের চালকরা মানছেন না গতিসীমার নির্দেশনা। অপরদিকে, পৌর এলাকয় প্রবেশ মুখ গুলোতেও সর্বোচ্চ গতিসীমা উল্লেখপূর্ব নেই কোনো সাইনবোর্ড। প্রশাসকেও এসব যানের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়না। সরোজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার মধ্যে মহাসড়কের পাশ দিয়ে মোটরযান মেরামতের ওয়ার্কসপগুলোর দোকান থাকায় রাস্তার উপর অবৈধ পার্কিং করে করা হয় কাজ। বিশেষ করে মল্লিকনগর, বৈশাখী মোড়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে, নিমতলা ব্রীজের পাশে, মেইন বাসস্ট্যন্ড ও তার আগে পরে যত্রতত্র সময় অসময়ে পরিবহন ও পণ্যবাহী ট্রাক দাড় করিয়ে রাখা হয়। আন্তঃজেলা যাত্রীবাহী গড়াই এবং রূপস পরিবহন ঝিনাইদহে ২০ মিনিট সময় অতিবাহিত করে সময়মত যশোর পৌঁছানর জন্য অতিরিক্ত গতি ব্যবহার করে চালকরা। যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও কালীগঞ্জ বাস টার্মিনাল থাকা সত্তেও সড়কের উপরেই বাসগুলো দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করায়। একই সাথে স্ট্যান্ডে সড়কের উপর লেগুনা, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক,রিকশা এবং মহাসড়ক ঘেঁষে বালুভর্তি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। এসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন বরাবরই নিরব ভূমিকা পালন করে।
কালীগঞ্জ মোটর মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব ফরিদ উদ্দীনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া টু খুলনা ৩৫টি গড়াই, এবং খুলনা টু কুষ্টিয়া ৩৫ টি রূপসা পরিবহন নিয়মিত চলাচল করে যাত্রী সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। যশোর থেকে হাসাদা ৮০ টি শাপলা পরিবহন জাতীয় ও অঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করে চলাচল করছে। আমরা গড়াই, রূপসা এবং শাপলা পরিবহনের আতরিক্ত গতি কমতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। আশারাখি দ্রুতই এ ব্যাপারে একটি সিদ্দান্ত আসবে।
বারবাজার হাইওয়ে থানার ওসি জাহানুর আলী বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। পৌর এলাকার মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং এবং যানবাহনের গতিসীমার উপর আমরা অভিযান পরিচালনা করব।
কালীগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হাদিউজ্জামান বলেন, চলতি অর্থবছরে পৌর এলাকার মধ্যে মহাসড়কে গতিসীমা নির্ধারণ করে সাইবোর্ড দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পৌর প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, মহা সড়কে দুর্ঘটনা রোধে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে আলাপ আলোচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পৌর এলাকার মধ্যে মহাড়ক ব্যবহারে যানবাহনের গতিসীমা সম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপনের ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি যোগ করেন।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে পৌর এলাকার ১০ কিলোমিটার মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
office@ukantho.com