স্বাস্থ্য
চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হলে ভারতমুখী প্রবণতা কমবে ৮০%
উচ্চকন্ঠ 03-Jan-2025 35
প্রতিটি মানুষের সঠিক চিকিৎসা পাওয়া তার মৌলিক অধিকার। দেশের প্রতিটি নাগরিককে নির্ভুল চিকিৎসা সেবা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। গত কয়েক মাস ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারত ভিসা বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে যারা নিয়মিত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করছিলেন, তারা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে গড়িমসি করার কোন সুযোগ নেই। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার কারনে মানুষের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারানোর কারণে এবং অব্যবস্থাপনা বিস্তার লাভ করায় মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে, অনেক কষ্টদায়ক ও ব্যয়বহুল হলেও সঠিক চিকিৎসা নিতে ভারতসহ অন্যান্য দেশে যেতে বাধ্য হচ্ছে । একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশ থেকে প্রতিদিন শুধু ভারতেই ৮ থেকে ১০ হাজার লোক যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই চিকিৎসার জন্যই ভারতে যেয়ে থাকে। এছাড়া ধনী, উচ্চবিত্তরা পৃথিবীর উন্নত দেশে যেমন সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব, ইংল্যান্ড ,আমেরিকায়, চিকিৎসা ও শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য যেয়ে থাকে। ভারতের চিকিৎসা করতে যাওয়া রোগীদের সাথে আলাপে জানা যায়, দেশে সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়া, ভুল চিকিৎসায় আস্থা হারানোর কারণে, জীবন বাঁচানোর জন্য ভারতে যাচ্ছেন। এতে করে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাচ্ছেন কোটি কোটি টাকা, যা বছরের হিসাবে বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ রোগীরা বলেন, দেশের চিকিৎসকরা রোগী দেখার ক্ষেত্রে অমনোযোগী, দুর্ব্যবহার, কম সময় দেওয়া, রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে অহেতুক অধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া। ডাক্তারের মনোনীত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো, দালালের দৌরাত্ম, এসব নানা কারণে দেশে চিকিৎসার উপর আস্থা না থাকায় রোগীরা অধিক হারে বিদেশে সঠিক চিকিৎসার জন্য যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থার অভাব শুধু সাধারন রোগীদেরই নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ছাড়াও উচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের এ অনাস্থার কারণেই তারা বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রায় যেয়ে থাকেন। দেশের চিকিৎসা অব্যবস্থার কারণ সম্পর্কে আরো জানা যায়, সর্ব বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি না হওয়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, মেধাবী চিকিৎসকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষার্থীদের চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে জরুরি রোগী দেখানোর ক্ষেত্রে অধিক সিরিয়াল, রোগ নির্ণয় ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির অভাব, টেকনিশিয়ান এর অভাব, প্রয়োজনীয় ডাক্তারের স্বল্পতা, ডাক্তারদের বাসা ও চেম্বারের অভাব, নিরাপত্তার অভাব, এছাড়া প্রভাবশালীদের প্রভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এতদিন অনেক পিছিয়ে রেখেছে। দেশে প্রতি বছর ৩৬ টি সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ৪ হাজার ৬৮ জন ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে ৬ হাজার ২৩৩ জন অর্থাৎ কমবেশি ১০ হাজার ২৯৯জন ডাক্তার বেরিয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। জানা যায় অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০জন ডাক্তারের পোস্ট থাকলেও বর্তমানে ৫/৬ জনের বেশি ডাক্তার নেই। এই ৭/৮ জন ডাক্তারের মধ্যে ছুটি ও ইমারজেন্সি সামাল দিতেই বহির্বিভাগে রোগী দেখার আর সুযোগ থাকে না। এতে করে প্রতি উপজেলায় ৩/৪ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা ডাক্তারের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। অথচ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। গ্রিসে ২২৮ জনে ১ জন ডাক্তার, স্পেনে ২০০ জনে ১ জন ডাক্তার, অস্ট্রেলিয়ায় ২৯৫ জনে ১জন ডাক্তার, ফ্রান্সে ২৯৬ জনে ১ জন ডাক্তার, আমেরিকায় ২৭৮ জনে ১ জন ডাক্তার সেবা দিয়ে থাকেন। সেখানে আমাদের দেশে ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী শুধু সরকারী কর্মরত ডাক্তারের হিসাবে ৬৫৭৯ জনে ১ জন ডাক্তার নিয়োজিত আছে, দেশে মোট ডাক্তারের হিসাবে ১৮৪৭ জনে ১ জন ডাক্তার নিয়োজিত আছে। বর্তমানে আরও নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই ২০ জন ডাক্তারের বসার জায়গার ও আবাসিক (থাকার জায়গা ) সংকট রয়েছে। সমাজের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ডাক্তারীর মতো এই মহৎ পেশায় মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত থাকেন, কিন্তু এদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নাই। অনেক সময় গ্রামের অশিক্ষিত মূর্খ সন্ত্রাসী যেনতেন কারণে গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতে দ্বিধা বোধ করে না। জেলা শহর হাসপাতালগুলোতে এর থেকেও আরো নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়াও হাসপাতাল গুলোতে বিভিন্ন অনিয়মে রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। বেশিরভাগ হাসপাতালে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে অপরিষ্কার এবং দুর্গন্ধে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালগুলো নিজেরাই রোগী হয়ে আছে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। কিছু কিছু যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। টেন্ডারে যন্ত্রপাতি ক্রয় করার ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে অথবা ঘুষ বানিজ্যের মাধ্যমে কমদামী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়, যা অল্পদিনেই নষ্ট হয়ে যায়। দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনেক অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট সম্পর্কে জানা যায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ডিগ্রী নেওয়ার ক্ষেত্রে আসন একেবারেই কম। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করার কারণে অনেক চিকিৎসক দেশের বাইরে চলে যায়, ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসকের স্বল্পতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। উপজেলা শহর গুলোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পোস্ট থাকলেও অধিকাংশ হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই বললেই চলে। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সরকারী হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে আবার অনেক হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ান এর অভাব আছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডাক্তারদের সাথে ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর একটা বড় কমিশন বাণিজ্য রয়েছে, দেশের গরীব রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্ট এর ফলাফল এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর সাথে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর সাথে মিল থাকেনা। তাছাড়া ডাক্তারের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রিপোর্ট না করলে গ্রহন করতে চান না। এ কারণেও এদেশের চিকিৎসার প্রতি অনেক রোগীর আস্থা নষ্ট হচ্ছে। নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য রোগীদের একটা বড় অংশ ভারতে চলে যাচ্ছে। ইদানিং অনেক নিম্নমানের ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ ভোক্তা অধিকারের নজরদারিতে ধরা পড়ছে। এ সব কারণেও দেশের চিকিৎসার ওপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। এছাড়াও ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল অপারেশন ও ওষুধের দাম অধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীরা দেশের চিকিৎসার উপর বিমুখ হচ্ছে। স্বল্পহারে উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক নিউরোসাইন্স হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশন, বার্ন ইন্সটিটিউট সহ বেশ কয়েকটি সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে হাসপাতাল তৈরি হওয়ায় আমরা তার সুফল ভোগ করছি। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর জনগনের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে যোগ্য ডাক্তারদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে মেধাবী ডাক্তার বিদেশে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। এতে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন ঘটবে। আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয়, পুরাতন জেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমানে দেশে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে, প্রচুর মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় বেশিরভাগ রোগী মারা যাচ্ছে। অন্তত প্রত্যেক মেডিকেল কলেজে করোনারী কেয়ার ইউনিট (সি, সি, ইউ) চালু থাকলে বেশীর ভাগ রোগী বাঁচানো সম্ভব হবে। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার সরবরাহের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে । কোন সময় ২০ জন, আবার কোন সময় ৪ জন থাকলে চিকিৎসার বিঘœ ঘটবে, এতে মানুষের আস্থা হারাবে। উপজেলা শহর গুলোতে ডাক্তারের পোস্টিং এর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করে নিরপেক্ষতার সাথে পোস্টিং দিতে হবে। ডাক্তারদের ডিউটির ক্ষেত্রে সেবা মূলক মনোভাব ও আন্তরিকতা থাকতে হবে। ডাক্তারদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে দেশ উন্নয়নের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। তাছাড়া দেশে সঠিক চিকিৎসা পেলে অধিক ব্যয়ে, অনেক কষ্টে দুঃসময়ে আপনজন ছাড়া বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া মানুষের কষ্ট লাঘব হবে। দেশে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসায় বিশ্বাস সৃষ্টি হলে আশেপাশের দেশ থেকে অধিকহারে মেডিকেল শিক্ষা গ্রহন ও চিকিৎসার জন্য ভারত, মায়ানমার, নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা, পাকিস্তান থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী ও রোগী দেশে আসবে। এতে করে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, বেকার সমস্যা অনেকাংশে দুর হবে ও অধিক হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে। দেশের মানুষের সকল চিকিৎসা দেশেই হলে, কষ্ট লাঘব হবে, কম টাকায় চিকিৎসা পাবে, ও দুঃসময়ে আপনজন কাছে থাকবে, এতে করে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
office@ukantho.com