প্রিয় ঝিনাইদহ
বিদ্যুৎ সংকটে কালীগঞ্জবাসি, ঘুম নেই, কাজ নেই, দুর্ভোগের শেষ নেই
উচ্চকন্ঠ 19-Jun-2026 34
হাবিব ওসমান, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহের উপজেলাবাসী। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং পল্লী বিদ্যুতের টানা ভেলকিবাজিতে লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী এক ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শহর ও উপজেলার বিদ্যুৎ গ্রাহকগণ। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এ পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত টানা অব্যাহত রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি উত্তোলন, রান্নাবান্না, খাবার সংরক্ষণ, পড়াশোনা ও অফিসের কাজেও দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। এদিকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা, চলতি মাসে মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং মাদ্রাসা অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষা এবং আগামী ২ জুলাই থেকে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বিদ্যুৎ না থাকাই শিক্ষার্থীরা ঠিকমত লেখাপড়া করতে পারছে না।
শহরের মহিলা কলেজ এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, আমাদের ঘরের প্রায় সব কাজই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। রান্না, কাপড় ধোয়া, ফ্রিজে খাবার রাখা, কিছুই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। অফিস শেষে বাসায় ফিরেও স্বস্তি নেই। গরমের মধ্যে ছোট শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
লোডশেডিংয়ের বড় প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সভাপতি সহিদুল ইসলাম বলেন, শহরের অধিকাংশ ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। গ্রাহকদের কাছ থেকে কাজের অর্ডার নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন বন্ধ থাকে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসার সুনামও নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পৌরসভার সামনে প্রিন্ট ও ফটোকপি ব্যবসায়ী মাসদুর রহমান বলেন, প্রতিদিন আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে এক ঘণ্টার অধিক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। দোকান খোলা থাকলেও কোনো কাজ হয় না। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ করাতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। গত কয়েক দিনে ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ।
নিশ্চিন্তপুর এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, আগেও লোডশেডিং ছিল, কিন্তু গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড গরমে শিশুদের কান্নাকাটি, বয়স্কদের দুর্ভোগ এবং রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)'র উপসহকারী আবাসিক প্রকৌশলী মিলন চন্দ্র সরকার বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের নির্দিষ্ট কারণ এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি কিংবা কারিগরি সমস্যার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা সীমিত বরাদ্দের মধ্যেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। পৌর এলাকার শ্রীরামপুরে নতুন একটি সাবস্টেশনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেটি চালু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। আশা করছি, আগামী রোববারের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ওই দিন বিভাগীয় কর্মকর্তারাও সরেজমিন পরিদর্শনে এসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (অফিস প্রধান) জয়দীপ সরকার বলেন, কালীগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড থেকে এর বেশি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে হচ্ছে। আমরা অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব বলেন, কালীগঞ্জসহ ঝিনাইদহের লোডশেডিংয়ের বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি জানিয়েছেন, দেশের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা বলা হলেও এখনো উন্নতি হয়নি। আমি আবারও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাময়িক লোড ম্যানেজমেন্ট দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ ধরনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রচণ্ড গরম, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত, সব মিলিয়ে কালীগঞ্জের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
office@ukantho.com