প্রিয় ঝিনাইদহ
সেবায় দীর্ঘসূত্রিতা ও চরম জনভোগান্তি, নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন কালীগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ
উচ্চকন্ঠ 10-Jun-2026 42
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ পৌরসভা— একটি ঐতিহ্যবাহী এ গ্রেডের পৌরসভা। প্রতি বছর পৌরবাসীর পকেট কেটে কোটি কোটি টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স, লাইসেন্স ফি, হাট-বাজার ইজারার অর্থ আদায় এবং কাগজে-কলমে বিশাল অংকের বাজেট ঘোষণা করা হলেও থমকে আছে উন্নয়ন কর্মকান্ড। নাগরিক সেবার বেহাল দশা, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, তীব্র যানজট আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম উদাসীনতায় পৌরবাসী আজ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু এক রহস্যময় কারণে নাগরিকদের এই হাজারো দুর্ভোগের দিকে নজর না দিয়ে যেন নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। সচেতন মহলের প্রশ্ন— কুম্ভকর্ণের এই দীর্ঘ ঘুম ভাঙাবে কে?
সেবা নিতে পদে পদে হয়রানি ও দীর্ঘ তালিকা
সরেজমিনে কালীগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। একজন সাধারণ নাগরিকের একটি বৈধ নাগরিক সনদ কিংবা ওয়ারেশকায়েম সনদ নিতে দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সেবাগ্রহীতারা পৌরসভায় আসামাত্রই তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক লম্বা শর্তের তালিকা— এটা নিয়ে আসেন, ওটা পরিশোধ করে আসেন, বকেয়া কর আগে দিন ইত্যাদি। নিয়মমাফিক সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরেও একটি সাধারণ সার্টিফিকেট বা সনদপত্র হাতে পেতে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ৭ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে, যা জনভোগান্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
সড়ক যেন মরণফাঁদ: কলেজপাড়ার চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ
পৌরসভার প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কলেজপাড়ার রাস্তাঘাটগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব খানাখন্দে পানি জমে একাকার হয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি উপচে রাস্তার বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যায়। এতে পুরো এলাকায় এক চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী বারবার বিষয়টি পৌর কর্তৃপক্ষের নজরে আনলেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সুরাহা বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঐতিহ্যবাহী ওয়াপদা খাল এখন ময়লার ভাগাড়
বর্তমান সরকার যখন দেশব্যাপী নদী, নালা ও খাল খনন সহ জলাশয় পুনরুদ্ধারে নানামুখী মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, ঠিক তখনই কালীগঞ্জ পৌরসভার চরম খামখেয়ালিপনায় ঐতিহ্যবাহী ওয়াপদা খালটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। পৌরসভার সংগৃহীত ময়লা-আবর্জনা পরিকল্পিত উপায়ে ডাম্পিং না করে সরাসরি এই খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে খালটি এখন একটি বিশাল বর্জ্যের স্তূপে বা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, যা আশেপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই বিষয়ে এর আগে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও পৌর প্রশাসনের টনক নড়েনি। অভিযোগ উঠেছে, তারা ব্যস্ত আছেন নিজেদের আখের গোছাতে!
নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচল ও তীব্র যানজটে নাভিশ্বাস
পৌর এলাকায় চলাচলকারী রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকসহ অন্যান্য গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিংয়ের মূল দায়িত্ব পৌরসভার। অথচ এই খাতে কোনো চেইন অব কমান্ড বা কার্যকর তদারকি নেই। যত্রতত্র পার্কিং এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রিক্সা-ভ্যান ও ইজিবাইক চলাচলের কারণে শহরের প্রধান মোড়গুলোতে সার্বক্ষণিক যানজট লেগে থাকে।
পৌরসভার কোনো নীতিমালা না থাকায় চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। এ নিয়ে প্রায়শই সাধারণ যাত্রী ও চালকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, এমনকি হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। তদুপরি, দিনের ব্যস্ততম সময়ে শহরের জনবহুল ও সংকীর্ণ রাস্তায় ভারী বাস, ট্রাক, ট্রলি ইত্যাদি অবাধে প্রবেশ করায় জনজীবন পুরোপুরি অতিষ্ঠ। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার যানজট নিরসনে কঠোর সিদ্ধান্ত ও রেজুলেশন গৃহীত হলেও পৌর শহরে তা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
কোটি কোটি টাকার বাজেট বনাম শূন্য উন্নয়ন: টাকা যাচ্ছে কোথায়?
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— প্রতি বছর মহাসড়ম্বরে কাগজে-কলমে যে কোটি কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, সেই বরাদ্দের অর্থ আসলে যাচ্ছে কোথায়? ওয়ার্ড পর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো টেকসই উন্নয়ন বা সংস্কার কাজ চোখে পড়ে না। রাজস্ব আদায়ের গ্রাফ প্রতি বছর ঊর্ধ্বমুখী হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কেন দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে, তার কোনো সদুত্তর নেই পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে।
জনৈক ভুক্তভোগী পৌরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিই, ব্যবসার লাইসেন্স নবায়ন করি। কিন্তু বিনিময়ে পৌরসভা আমাদের কী দিচ্ছে? ভাঙা রাস্তা, ড্রেনের দুর্গন্ধ আর যানজট। একটা সাধারণ কাগজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কোটি কোটি টাকার বাজেট শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
প্রতিবেদকের শেষ কথা:
একটি এ গ্রেডের ঐতিহ্যবাহী পৌরসভা এভাবে দিনের পর দিন অভিভাবকহীন ও স্থবির হয়ে থাকতে পারে না। জনভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি। কালীগঞ্জ পৌরসভা কি সত্যিই তার নাগরিকদের ন্যূনতম অধিকার ফিরিয়ে দেবে, নাকি কুম্ভকর্ণের এই ঘুম পৌরবাসীকে আরও দীর্ঘমেয়াদী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে— সেটাই এখন দেখার বিষয়।
office@ukantho.com