প্রিয় ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বেহালদশা; চিকিৎসক, ঔষধ ও টিকার অভাবে বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা
উচ্চকন্ঠ 21-May-2026 14
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চিত্র দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকটের কারণে জেলার সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, শিশু রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং অবৈধ ও মানহীন বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দৌরাত্ম্যে স্বাস্থ্যখাত কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ঝিনাইদহে হাম উপসর্গ ও নিউমোনিয়াসহ শিশুরোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যদিও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো জেলাকে ‘গ্রিন জোন’ হিসেবে দাবি করছে, বাস্তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাম উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি হিসাবের বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
গণস্বাস্থ্যসেবা আন্দোলনের সংগঠক আবু তোয়াব অপু বলেন, “সরকারি হাসপাতালে এখন আর মানসম্মত চিকিৎসার পরিবেশ নেই। সাধারণ রোগী, নারী ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সেবার ব্যবস্থা নেই। রাজনৈতিক প্রভাব ও ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। হাম ও নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হলেও সঠিক জরিপ না থাকায় প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি, বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
হাসপাতালে রোগীর চাপ, চিকিৎসক নেই
ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগীর ভিড় থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও সেবিকার অভাবে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার পরও অনেক সময় চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অনেকেই চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
হাসপাতালের সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি ও শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, বেডের অভাবে রোগীদের মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশু বিভাগের জন্য অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ৪৭ হলেও প্রতিদিন সেখানে প্রায় ২০০ শিশু ভর্তি থাকে।
শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আনোরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শতাধিক শিশু ভর্তি থাকে। কিন্তু শয্যা মাত্র ৪৭টি। ফলে অতিরিক্ত রোগীদের মেঝে ও বারান্দায় রাখতে হয়। প্রতিটি শিফটে মাত্র তিনজন সেবিকা দিয়ে এত রোগীর সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক রোগীকেই পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
কমিউনিটি ক্লিনিকে তীব্র ওষুধ সংকট
জেলার ৬ উপজেলার ৬৭টি ইউনিয়নে স্থাপিত ১৮৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ওষুধ সংকট। একসময় এসব ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হলেও বর্তমানে অধিকাংশ ক্লিনিকে মাত্র ২-৩ ধরনের ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও আবার ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ।
সদর উপজেলার কালুহাটি কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রভাইডার মাজেদুল হক বলেন, “রোগীরা ওষুধ নিতে আসে, কিন্তু আমাদের কাছে দেওয়ার মতো ওষুধ নেই। এখন শুধু স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়েই রোগীদের বাড়ি পাঠাতে হচ্ছে।” এছাড়াও ওষুধ না পেয়ে অনেক দরিদ্র রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি ফার্মেসি থেকে অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনছেন।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ০৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত ৪৫ দিনে হাম উপসর্গ নিয়ে ১২৫ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে। এর মধ্যে ১০৫ জন শিশুকে ভর্তি করা হয় এবং ৯৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এমওসিএস ডা. ফারহানা তাসনীম বলেন, “জেলা এখনো গ্রিন জোনে রয়েছে। প্রতিটি রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, সরকারি তথ্যের বাইরে আরও বহু শিশু হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়ছে উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থা
জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও চিকিৎসক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
* ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের ৮৭ চিকিৎসকের মধ্যে ২০টি পদ শূন্য।
* ৮ জন ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১ জন।
* নেই কোনো প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট।
* ৪ জন এনেস্থেটিস্টের মধ্যে ৩টি পদ শূন্য।
হরিণাকুন্ডু, শৈলকুপা, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। কোথাও নেই আবাসিক মেডিকেল অফিসার, কোথাও নেই প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট কিংবা এনেস্থেটিস্ট।
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩ জন সহকারী সার্জনের মধ্যে ১০টি পদই খালি। ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকলেও চিকিৎসক সংকটে কার্যত অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য, রোগীরা জিম্মি
সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগে জেলায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ও অননুমোদিত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।
তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২২৭টি নিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে মাত্র কয়েকটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এছাড়া শতাধিক প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠান চলছে। ভুল রিপোর্ট, ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে প্ররোচিত করেন। সেখানে উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে রোগীদের মোটা অঙ্কের বিলের মুখে ফেলা হয়।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, “চিকিৎসক সংকট অত্যন্ত প্রকট। মানুষের চাহিদার তুলনায় জনবল কম হওয়ায় কাক্সিক্ষত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কমিউনিটি ক্লিনিকেও ওষুধ সরবরাহ কমে গেছে। আশা করছি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
তিনি আরও জানান, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় জেলার নির্ধারিত সংখ্যার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন হয়ে শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
জনদুর্ভোগ চরমে
প্রায় ১৮ লাখ মানুষের জেলার স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতালগুলো এখন নানা সংকটে জর্জরিত। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব, বেড সংকট এবং স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত, শিশু ওয়ার্ড সম্প্রসারণ এবং অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
office@ukantho.com