প্রিয় ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহ পৌরসভায় চেক জালিয়াতি: সাবেক মেয়র মিন্টুসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট
উচ্চকন্ঠ 04-Apr-2026 44
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহ পৌরসভায় চেক জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক বজলুর রহমান শুক্রবার আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শুক্রবার দুপুরে ঝিনাইদহ দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাবু বিশ্বাস। মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন পৌরসভার সাবেক সচিব আজমল হোসেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান চান এবং হিসাবরক্ষক মখলেচুর রহমান। তারা ২০১১ সালের ১ জুন থেকে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭টি কাজের বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ ও ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকের ১৪২৫০৩নং অ্যাকাউন্ট থেকে এই টাকা উত্তোলন করেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১ জুন থেকে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে পৌরসভার ৩৭টি কাজের বিপরীতে বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে চেক ইস্যু করে আসামিরা সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাব এবং জনতা ব্যাংকের অপর একটি হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা চেকের অঙ্ক বাড়িয়ে এবং কথায় লিখিত টাকার অংশ পরিবর্তন করে প্রকৃত বিলের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ তুলে আত্মসাৎ করেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক তদন্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানান, সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে মাত্র তিন লাখ ৫৮ হাজার ১৯ টাকার বিপরীতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই ধরনের কৌশলে বিভিন্ন সময়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ নিয়ে সাইদুল করিম মিন্টুর বিরুদ্ধে দুদক ইতোমধ্যে তিনটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে।
তিনি আরও বলেন, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ঝিনাইদহ শাখার হিসাব নং ৩১৬ থেকে তিন লাখ আটান্ন হাজার উনিশ টাকার বিপরীতে চেকের মাধ্যমে তারা ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত তুলে নেন। এই নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর বিরুদ্ধে দুদক তিনটি মামলায় চার্জসীট দিল।
নওশের ছাড়াও যাদের নামে চেক ইস্যু করা হয়েছে তারা হলেন, প্রসাশনিক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান চানের নামে ১২টি, নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল উদ্দীনের নামে ২০১৩ সালের ৩ মার্চ ৩০৬ নং ভাউচারে ৩ হাজার ২১২ টাকার স্থলে ২ লাখ ৩ হাজার ২১২ টাকা, ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টম্বর হিসাব রক্ষক মখলেছুর রহমানের নামে ৭৯ নং ভাউচারে ১৩ হাজার দুই’শ টাকার স্থলে ২ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা, ২০১১ সালের ৬ জুন দেলোয়ার হোসেনের নামে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, ২০১১ সালের ২৩ আগষ্ট এবং ২০ সেপ্টম্বর ১১৩ ও ১৫৫ নং ভাউচারে সাইদুর রহমানের নামে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৩ টাকার স্থলে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৩ টাকা, কনজারভেন্সি পরিদর্শক সামছুল আলমের নামে যথাক্রমে ১০, ৪৫, ১০০, ১৪৮ ও ৩৮২ নং ভাউচারে এক লাখ ৪৮ হাজার ২২ টাকার স্থালে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ২২ টাকা, ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি ২২১ নং ভাউচারে কমিশনার তোফাজ্জেল হোসেনের নামে ২১ হাজার টাকার স্থলে ২ লাখ ২১ হাজার, ২০১৩ সালের ১১ আগষ্ট ৩৭ নং ভাউচারে পানি বিভাগের বিল ক্লার্ক আনোয়ার হোসেনের নামে ৫ হাজার ৪০ টাকার স্থলে ২ লাখ ৫ হাজার ৪০ টাকা, একই বছরের ১১ আগষ্ট ৩৪ নং ভাউচারে কমিশনার মতলেব মিয়ার নামে ৫০ হাজার টাকার স্থলে দেড় লাখ টাকা, ওই বছরের ৪ ফেব্রয়ারি ২৪৩ নং ভাউচারে জনৈকা সাহিনা মৌসুমির নামে ১০ হাজারের স্থলে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, ১১০ নং ভাউচারে কমিশনার সাইফুল ইসলাম মধুর নামে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ নং একাউন্ট থেকে যার চেক নং ৯৩৯৪৮৩৯ ৩০ হাজার টাকার স্থলে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা, ২০১৪ সালের পহেলা মে মাসে ৩০০ নং ভাউচারে মিঠু ইলেক্ট্রনিক্সের নামে ১৫ হাজার ৪১০ টাকার স্থলে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪১০ টাকা, ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রয়ারি ২১৯ নং ভাউচারে কমিশনার বশির উদ্দীনের নামে ৫০ হাজারের স্থলে আড়াই লাখ টাকা, ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকের ১৪২৫০৩ নং চেকে রবিউল ইসলামের নামে ৯ হাজার ৬৫০ টাকার স্থলে ৪ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা, ২০১২ সালের ১৮০ ও ২০১৪ সালের ২৮০ ভাউচারে স্যানেটারি ইন্সপেক্টর শংকর কুমার নন্দীর নামে ৭২ হাজার টাকার স্থলে ৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ১৩৩ নং ভাউচারে ইঞ্জিনিয়ার মুন্সি আবু জাফরের নামে ২১ হাজারের বিপরীতে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ভাউচারে স্বল্প অঙ্ক উল্লেখ থাকলেও চেকে তা বহুগুণ বাড়িয়ে উত্তোলন করা হয়। যেমন ২০১১ সালের ১ জুন পৌরসভার ক্যাশ বইয়ে নওশের আলীর নামে ১০ হাজার টাকা লিপিবদ্ধ আছে। অথচ ১০ হাজার টাকার স্থলে সোনালী ব্যাংকের ৩১৬ নং একাউন্ট থেকে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকর্তার নামে ইস্যুকৃত একাধিক চেকে একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী, কমিশনার, বিল ক্লার্ক, ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন পদে থাকা ব্যক্তিদের নামে স্বল্প অঙ্কের বিল দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য মিলেছে।
এমন অভিযোগের একটির বিষয়ে সত্যতা জানতে ঝিনাইদহ শহরের মিঠু ইলেক্ট্রিকে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, তাদের দোকান থেকে ২০১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি দুই হিসাবে ৩২’শ টাকা, একই বছরের ৭ জুলাই ২৫ হাজার ৫০০ টাকা, ২০ এপ্রিল ৯৩০০ টাকার হিসোব পরিশোধ করা হয়। কোনক্রমেই তাদের দুই লাখ টাকার বিল পৌরসভা দেয়নি। অথচ পৌরসভার নথিতে দেখানো হয়েছে দুই লাখ টাকার বেশি।
এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তালেব জানান, “চেক জালিয়াতি মামলায় ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আদালতে চার্জসীট দাখিল করেছে। চার্জশিট দাখিলের পর আসামিদের আদালত থেকে জামিন নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তারা ইতোমধ্যে জামিন নিয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের এ চার্জশিটে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি সুসংগঠিত চিত্র উঠে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মামলাটি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করায় ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
office@ukantho.com