প্রিয় ঝিনাইদহ
অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন, শিক্ষার্থীদের হাতে নোট গাইডের তালিকা: কর্তৃপক্ষ নীরব কেন?
উচ্চকন্ঠ 22-Feb-2025 33
হুমায়ুন কবির, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ সরকার প্রদত্ত বিনামূল্যের পাঠ্যবই না পৌঁছালেও স্কুলে স্কুলে পৌঁছে গেছে লেকচার পাবলিকেশন্স কোম্পানী কর্তৃক প্রদত্ত নোট গাইড বইয়ের তালিকা। শিক্ষার্থীদের হাতে অবৈধ নোট গাইডের এই তালিকা তুলে দেওয়ার কাজটি করছে অনিবন্ধিত কথিত নামধারী মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি ও স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা । গত ক বছর ধরে এ সমিতি বই কোম্পানীর নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোরা, ভুড়িভোজ ও বার্ষিক বনভোজন করে আসছে। চলতি বছর মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মান্দারবাড়িয়া চাঁদপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান কামাল ও সাধারণ সম্পাদক চাচড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হারুন অর রশিদ বই কোম্পানীর নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা গ্রহণের জন্য ৪ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেন। এই চার জন সদস্য হলেন- মোবারক আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান তরিকুল ইসলাম, রায়গ্রাম বাণীকান্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান পলাশ মুখার্জী, সুন্দরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান ও বিএইচএ বি মুন্দিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহসিন আলী।এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লেকচার পাবলিকেশন্স লিমিটেড কোম্পানির নোট গাইড এ বছর বিদ্যালয়সমূহে চালানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।বর্তমান সরকার ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিচ্ছে। প্রতিটি শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণ এবং ইংরেজী গ্রামার বইও বিনামূল্যে প্রদান করা হয়েছে। অথচ লেকচার কোম্পানীর বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজী ব্যাকরণ এবং সহায়ক বইয়ের নামে নিষিদ্ধ নোট গাইড কেনার জন্য স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সহায়তায় লেকচার পাবলিকেশন্স কোম্পানীর প্রতিনিধিরা শ্রেণিকক্ষে যেয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছে। এখনো পর্যন্ত সরকারি বিনামূল্যের বই পরিপূর্ণরূপে শিক্ষার্থীদের হাতে না পৌঁছালেও চড়া মূল্যের অবৈধ নোট গাইড শিক্ষার্থীদের কেনানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সমিতিভুক্ত শিক্ষকরা। শিক্ষকদের চাপে পড়ে অভিভাবকরা ওই তালিকা ধরে বই কিনতে লাইব্রেরীতে ছুটছেন। এতে চরম ক্ষাভের সৃষ্টি হয়েছে অভিভাবকদের মাঝে। আর এসব অনিয়ম দেখার দায়িত্বে থাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুল আলিম যেন কিছু দেখেও না দেখার ভান করে চলেছেন। সমিতির নেতাদের সাথে তার রয়েছে দারুণ সখ্যতা। ২০২৪ সালের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কাথিত শিক্ষক সমিতি বই কোম্পানীর নিকট থেকে ক্রয় করে এবং তা স্কুলে স্কুলে বিক্রি করে মোটা অংকের অর্থ বাণিজ্য করেছিল। শিক্ষক সমিতির এসব দূর্নীতির বিষয়ে উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার বলা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এমনকি এ নিয়ে গণমাধ্যমেও একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও দায়িত্বশীলদের নীরব ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। বিধিবহির্ভূতভাবে নিষিদ্ধ নোট গাইড চালানো এসব শিক্ষকদের খুটির জোর আসলে কোথায়?
সাজিদুর রহমান নামের একজন অভিভাবক জানান, আমার সন্তান দশম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী। স্কুল থেকে বইয়ের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী বই কিনতে প্রায় ছয় হাজার টাকা লাগবে। স্কুলে সরকারি বই না পড়িয়ে কেন নোট গাইড পড়ানো হবে? শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাসই করায় না। তারা ব্যবসা খুলে বসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, এবার নতুন সিলেবাস হওয়ায় সমিতি প্রায় অর্ধ কোটি টাকা রয়েলিটির বিনিময়ে লেকচার গাইড ধরিয়েছে। এমনকি বই কোম্পানির পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যদেরকে এক লক্ষ করে টাকাও দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের অনেকেই নোট গাইড চালানোর বিপক্ষে থাকলেও সমিতির কতিপয় নেতার চাপাচাপিতে বই চালাতে বাধ্য হচ্ছে। সভাপতি কামরুজ্জামান কামাল কতিপয় অসৎ শিক্ষকদের সাথে নিয়ে মোটা টাকার লোভে এসব কাজ করে বেড়াচ্ছেন। নোট গাইড ধরানোর যাচাই-বাছাই কমিটিতে থাকা শিক্ষকরা জানান যে, তারা কোম্পানীর বই যাচাই বাছাই করে সমিতিকে জানিয়েছেন। সমিতির লেকচার কোম্পানির বই পছন্দ করেছে। তবে কোম্পানি কর্তৃক টাকা নেওয়ার বিষয়টি তারা অস্বীকার করেন।
কালীগঞ্জ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) কামরুজ্জামান কামাল জানান,এখনো বই চূড়ান্ত হয়নি।কোম্পানির লোক স্কুলে বইয়ের তালিকা দিতে পারে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সমিতির মাধ্যমে নিষিদ্ধ নোট গাইড চালানোর বিষয়টি তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ( অ.দা) দীনেশ চন্দ্র পালের নিকট অবৈধ নোট গাইড বইয়ের তালিকা স্কুলে স্কুলে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার জানা নেয়। সরকার বই দিচ্ছে যেখানে সেখানে নিষিদ্ধ নোট গাইড চালানোর কোনো নিয়ম নেই। আমি রবিবার বিষয়টি দেখব। বর্তমানে অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এবং কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেদারুল ইসলাম বলেন, স্কুলে নোট গাইড চালানোর নিয়ম নেই। কোনো স্কুলে নোট গাইড এর তালিকা সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা সেটিও আমার জানার বাইরে। ঝিনাইদহ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ.বি.এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ নোট গাইড চালানোর কোনো সুযোগ নেই। এমন ঘটনা ঘটলে অবশ্যই তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
office@ukantho.com