প্রিয় ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জে নারীকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, ঘটনার নেপথ্যে যা জানা গেল
উচ্চকন্ঠ 07-Jan-2026 466
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এক নারীকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছেন। পুলিশ এ ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করেছে।
গত ৩১ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ পৌর শহরের আড়পাড়া নদীরপাড়া গ্রামে ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, ভুক্তভোগী নারীর বাড়িতে বহিরাগত দুই যুবকের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় তাদের ‘আপত্তিকর’ অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা নারীসহ ওই দুই যুবককে বাড়ির পাশের গাছে বেঁধে রাখে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সরেজমিনে গেলে ভুক্তভোগী নারীর বাড়ির ভাড়াটিয়া সুমি খাতুন জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর বাড়িতে বহিরাগত দুই পুরুষ অবস্থান করছে, এমন অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় বাড়ির মালিক ভুক্তভোগী নারীর ঘর থেকে দুজন যুবককে আটক করে স্থানীয়রা। পরে উত্তেজিত স্থানীয়রা ওই নারীর কাছে দুই যুবকের পরিচয় জানতে চান। ওই নারী দুই যুবককে তার আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দেন। এসময় স্থানীয়রা আটক দুই যুবককে তাদের পরিচয় দিতে বললে তারা একেক সময় একেক রকম কথা বলতে শুরু করে। এ নিয়ে এক পর্যায়ে স্থানীয়রা তাদের মাঝে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বাড়ির বাইরে বের করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
সুমি খাতুন বলেন, বাড়ি মালিক মহিলা মানুষ। তার কাছে অনেক মানুষ আসা যাওয়া করে। আমরা দেখেও না দেখার ভান করি। আমরা ভাড়াটিয়া, আমরা তো অনেক কিছু বলতে পারি না। তবে ৩১ তারিখে দুইটা ছেলে রাতের বেলা বাড়ির মালিকের (মহিলা) কাছে আসে। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় লোকজন ঘরে ঢুকে তাদের আপত্তিকর অবস্থায় ধরে ফেলে। পরে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে।
আরেক প্রতিবেশী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মেহেদী হাসান জুয়েল জানান, বাড়ির সামনে গাছের সঙ্গে ওই নারীসহ দুই তরুণ যুবককে বেঁধে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে উত্তেজিত স্থানীয় মহল্লার লোকজন। এসময় কেউ কেউ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা দুই যুবককে মারধর করেন।
প্রতিবেশী আরেক নারী বলেন, ঘটনা ঘটলো এক রকম, ইন্টারনেটে দেখছি আরেক রকম। কোনো পুরুষ মানুষ ঐ মহিলাকে মারেনি। দু-একটা চড় থাপ্পড় যা মারার, মহিলারাই মেরেছে। এখন একজনের বাড়িতে কে আসছে আর কে যাচ্ছে, তা আমরা দেখলেও তো বলতে পারি না। বলা ঠিকও না। তবে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
আড়পাড়া নদীরপাড় গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ঘটনার দিন আমি শহরে ছিলাম। থানা থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হলো, আপনার গ্রামে একটা মেয়েলি ঝামেলা হচ্ছে, গিয়ে মীমাংসা করে দেন। আমি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, ওই নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। পরে গ্রামের মুরুব্বিরা এসে ওই নারীকে সতর্ক করে তার বাঁধন খুলে দেয়। আটক অপর দুই তরুণকেও ছেড়ে দেয়। ঘটনা ৩১ তারিখের। পরে শুনছি, ওই নারী এখন ধর্ষণের মামলা দিয়েছে। আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য মানববন্ধন করতে গেলেও পুলিশ আমাদের কর্মসূচি করতে দেয়নি।
ইব্রাহিম হোসেন আরও বলেন, ওই নারীর জামাতা পুলিশে চাকরি করেন। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একটা মহল পুলিশকে প্রভাবিত করেছে। কারণ, ওই নারীর সম্পর্কে থানা পুলিশ খুব ভালো করেই সবকিছু জানে। পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করলে আশা করি প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতাজনিত কারণেকথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং কালীগঞ্জ থানায় আছেন বলে জানান।
এদিকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনায় ঐ নারী পরদিন ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি হন এবং কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যান। এরপর ৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তিনি আবারও ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি হন। এসময় কালীগঞ্জ থানার নারী পুলিশ সদস্যসহ একাধিক পুলিশ সদস্য ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে ছিলেন। পরে ধর্ষণের নমুনা প্রদান ও শারীরিক পরীক্ষা শেষে ভুক্তভোগী নারী পুলিশসহ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালীগঞ্জের এক নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানি। তিনি ই (৫ জানুয়ারি) হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। এরপরে আর কি হয়েছে, তা জানা নেই।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন। আমরা মামলা রেকর্ড করেছি। মামলার এজাভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
office@ukantho.com