প্রিয় ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জে মাটি কাটার মহোৎসব: প্রশাসন নিরব
উচ্চকন্ঠ 15-Dec-2025 68
হুমায়ুন কবির, নিজস্ব প্রতিবেদক: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবৈধভাবে কৃষিজমি, পতিত জমি এবং পুকুর খননের নামে মাটি কেটে বিক্রির মহোৎসব চলছে। উপজেলার পুকুরিয়া, ঈশ্বরবা,বারপাখিয়া, খালকুলা, কোলা,রায়গ্রাম,বেথুলী, মালিয়াটসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠে এক্সক্যাভেটর মেশিন দিয়ে দিনে রাতে কৃষি, জমির উর্বর মাটি কেটে ইটভাটাসহ জমি ভরাট কাজে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনের নির্বিকার কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর ভূমিকায় মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।
জানা গেছে, এ উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি তিন ফসলি। এখানে সোনালি আঁশখ্যাত পাট, রবিশস্য ও ধানের আবাদ করা হয়। কিন্তু প্রতিবছর এ উপজেলায় বিপুল পরিমাণ জমির মাটি কাটা হচ্ছে। এ কারণে দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কৃষকদের থেকে মাটি কিনে তা ইটভাটাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হচ্ছেন মাটি ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, উপজেলায় কয়েকটি শক্তিশালী মাটি ব্যবসায়ী চক্র গড়ে উঠেছে। এরা দরিদ্র কৃষককে নানা প্রলোভন দেখিয়ে জমির মাটি কিনে নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের তাগিদে নগদ অর্থ পেতে ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। ৮-১০ ফুট গভীর করে মাটি কাটার ফলে অনেক জমি ডোবায় পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে ফসল বা মাছ চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া কৃষিজমি থেকে কেটে নেওয়া মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রাক বা ট্রলি গাড়ি। এসব ট্রাক বা ট্রলির কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ রাস্তাঘাটে খানাখন্দ তৈরি হয়ে দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। রাস্তায় মাটি পড়ে চলাচলের অনুপযোগী হচ্ছে । এছাড়া মাটি টানা ট্রাক ও ট্রলি চলাচলের কারণে অন্যান্য আবাদি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা।
সরেজমিন দেখা যায়, নিয়ামতপুর ইউনিয়নের বারপাখিয়া, মল্লিকপুর এলাকায় মাটি ব্যবসায়ীরা দিনে ও রাতের বেলা এক্সক্যাভেটর দিয়ে ফসলি জমির মাটি কাটছেন। কেটে নেওয়া মাটি ট্রাক বা ট্রলিতে করে কাছের ইটভাটায় পাঠানো হচ্ছে। পৌর এলাকার ঈশ্বরবা নামক গ্রামের মাঠ থেকে মাটি কেটে পার্শ্ববর্তী ইটের ভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। সিমলা রোকনপুর ইউনিয়নে বড় এবং ছোট সিমলার মাঠে প্রতিযোগিতা করে চলছে মাটির ব্যবসা। রায়গ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠেও একই অবস্থা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাটি ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, "আমরা তো আর মাদকের ব্যবসা করছি না। একটু মাটির ব্যবসা করছি, তাতেও এত সমস্যা। সবাইকে ম্যানেজ করেই তো করা হচ্ছে, তাহলে অসুবিধা কোথায়? " উপজেলার বারপাখিয়া গ্রামের ইনছার আলী জানান, স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তা না হলে বারবার স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যাপারটি অবগত করেও মিলছে না কোনো সুফল। এমনকি ধান কাটার পর থেকে উপজেলা বিভিন্ন মাঠে মাঠে মাটি কাটার মহোৎসব চললেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে কোনো জরিমানা বা দন্ড প্রদান করতে আজও দেখা যায়নি। প্রশাসন যদি শক্ত হতো তাহলে এভাবে মাটি কেটে বিক্রি করতে পারত না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কালীগঞ্জে বিভিন্ন এলাকায় জিন্নাহ আলী, মারুফ হোসেন,কাদের আলী,এনামুল হোসেন, মিন্টু মিয়া, মতি মিয়াসহ অনেকেই এ মাটি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এসব ব্যবসায়ী স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, আমার পাশের জমি থেকে মাটি কাটছে আজ কয়দিন হলো। এতে করে আমার জমি উঁচু হয়ে গেছে। ফলে আমার জমিতে আর পানি দাঁড়াবে না। চাষ কাজে আমাকে এবার দুর্ভোগ পোহাতে হবে। মাঠে মাঠে এভাবে আবাদি জমির মাটি কেটে নিয়ে সব কৃষকদের ক্ষতি করার কোন মানে হয় না।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম রনি বলেন, ফসলি জমি থেকে টপ সোয়েল বা উপরের মাটি কেটে নিলে জমি তার উর্বর শক্তি হারায়। যার প্রভাব পড়ে ফসল উৎপাদনে। এজন্য কৃষি জমি থেকে মাটিকাটা বন্ধ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়ার খবর পেলে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের সহায়তা নিয়ে বন্ধ করছি। বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে নিজে গিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করতে না পারলেও মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা প্রদান করছি।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাটি ব্যবসায়ীদের অর্থদণ্ড দেওয়া একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা সহ ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি যোগ করেন।
office@ukantho.com