স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, বিনোদন-প্রবীনদের জন্য প্রয়োজন
উচ্চকন্ঠ 30-Sep-2025 134
এম. এ. কাদের: প্রতিটি মানুষের জীবনে জরা বা বার্ধক্য এক অনিবার্য সত্য। শৈশবের সোনালি সকাল পার হয়ে, যৌবনের উজ্জ্বল দুপুর পেরিয়ে যখন জীবনের ব্যস্ত বিকেলও শেষ হয়ে আসে, তখন সামনে দাঁড়িয়ে যায় জীবন সায়াহ্নের গোধূলিবেলা। এই সময়টিকে শান্তিময়, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ করে তোলার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, বর্তমান সমাজে প্রবীণরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। আমাদের সমাজে প্রবীণদের কল্যাণে কার্যকর প্রস্তুতি এখনো গড়ে ওঠেনি, ফলে তারা নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বার্ধক্য কাটাচ্ছেন। অথচ আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের প্রবীণ, তাই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার বিষয়টি সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
প্রবীণদের প্রতি দয়া বা দাক্ষিণ্যের দৃষ্টিতে নয়, বরং মানবাধিকার ও প্রাপ্য মর্যাদার ভিত্তিতে আচরণ করতে হবে। প্রবীণদের অধিকার বাস্তবায়ন মানে কেবল ভাতা বা চিকিৎসা নয়; বরং তাদের প্রতি সামাজিক সম্মান, পারিবারিক যত্ন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য গণসচেতনতা জরুরি। স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, যত্ন ও দায়িত্বের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং গণমাধ্যমেও প্রবীণবান্ধব কনটেন্ট বাড়াতে হবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে এবং সেই সঙ্গে দ্রুত বেড়ে চলেছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ কোটি, বর্তমানে তা ১১০ কোটির বেশি। ২০৩০ সালে সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৫০ কোটি এবং ২০৫০ সালে তা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রবীণের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ২০২৫ সালে তা হবে প্রায় ২ কোটি, আর ২০৫০ সালে সাড়ে চার কোটির কাছাকাছি পৌঁছাবে। জনসংখ্যাবিদদের মতে, ২০৬০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ দ্রুত একটি বৃদ্ধ সমাজে রূপ নিচ্ছে।
একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৫০ লাখ প্রবীণ বর্তমানে অবহেলিত, নিঃসঙ্গ এবং চিকিৎসাবঞ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। যৌবনে যারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও দক্ষতা দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করেছেন, সন্তানের জন্য জীবনের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, তারা বার্ধক্যে এসে অবহেলার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন। আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সন্তানরা আলাদা করে রাখছে, চিকিৎসা দিচ্ছে না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পেনশনের টাকা বা বাড়িঘর জোর করে লিখে নিচ্ছে। নেশাগ্রস্ত সন্তানদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হচ্ছেন কেউ কেউ। অথচ রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কাঠামোতে প্রবীণদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা নেই বললেই চলে। শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য যেমন রাষ্ট্র ও অভিভাবকের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রবীণদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করাও সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব।
এখনই প্রয়োজন প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি উপজেলা শহরে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা দরকার, যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যাবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য আলাদা ইউনিট থাকা উচিত। যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাস, ট্রেন ও আকাশপথে প্রবীণদের জন্য অর্ধেক ভাড়া এবং সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি, সব প্রবীণের জন্য নিয়মিত প্রবীণ ভাতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়াও সময়ের দাবি।
আমাদের দেশে অনেক সন্তানের আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও কর্মব্যস্ততার কারণে তারা বাবা-মায়ের যতœ নিতে পারে না। আবার অনেকে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে বিদেশে গিয়ে সন্তানের সঙ্গে থাকতে চান না। সামাজিক বাস্তবতা, মানসিকতা ও পারিবারিক দূরত্বের কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ফলে বার্ধক্য আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠছে। তাই শুধু বৃদ্ধাশ্রম নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দময় আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে পাঁচ একর জমির ওপর আনন্দ আশ্রয় নামের প্রবীণবান্ধব আবাসন গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই আনন্দ আশ্রয়ে থাকবে হাসপাতাল ও নার্সিং সেবা, মানসম্মত খাবার, বিনোদনের ব্যবস্থা, প্রার্থনার স্থান, খেলার মাঠ, ব্যায়ামাগার এবং আরামদায়ক আবাসন। একই বয়সের মানুষ একসঙ্গে থাকার কারণে প্রবীণরা এখানে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সময় কাটাতে পারবেন। ধনী প্রবীণরা খরচ বহন করে থাকতে পারবেন, আর গরিব ও অসহায় প্রবীণদের জন্য থাকবে সরকারি খরচে থাকার সুযোগ। প্রয়োজনে সন্তানরা বিদেশ থেকে এসে কিছুদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে থাকতে পারবেন। এতে একদিকে প্রবীণদের জীবনে আনন্দ আসবে, অন্যদিকে সন্তানদের মধ্যেও থাকবে মানসিক শান্তি।
প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, তারা অতীতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আজ তারা দ্বিতীয় শিশুর মতো যত্ন ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাই প্রবীণদের অবহেলা না করে মর্যাদার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।
অসহায় প্রবীণদের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান, দানশীল ও সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, আজ প্রবীণদের জন্য যে আন্দোলন ও দাবি তোলা হচ্ছে, কাল সেটাই তাদের নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়াবে। প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই লড়াই আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিত করার আন্দোলন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ইমেইলঃ makader958@gmail.com
office@ukantho.com