প্রিয় ঝিনাইদহ
পুলিশকে আসামী করায় কোটচাঁদপুরে জামায়াতের ৩ নেতাকর্মী হত্যা মামলা আজো আলোর মুখ দেখেনি
উচ্চকন্ঠ 02-Sep-2025 32
মামুন হোসেন, কোটচাঁদপুর প্রতিনবেদক: কোটচাঁদপুরে প্রকাশ্যে দিবালোকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিন নেতা কর্মিকে হত্যা। করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পুলিশ বাহিনী। অথচ দীর্ঘ প্রায় এক যুগেও ভুক্তভোগী পরিবার গুলো হত্যা কান্ডের বিচার চাইতে পারেনি। বরং থানা পুলিশ ওই পরিবার গুলোর একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে গায়েবী মামলায় গ্রেফতার করে চালিয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
বিএনপি ও জামায়াতের ঘাঁটি (কোটচাঁপুর-মহেশপুর) নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-৩ আসন যে কারণে আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিরোধীদের দমন করতে ও আওয়ামীলীগের শক্ত অবস্থান গাড়তে পুলিশের গায়েবী মামলা ছিল একমাত্র পুঁজি। এ মামলাকে পুঁজি করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের একের পর এক গায়েবী মামলা চাপানো হয়েছে।
সর্বপ্রথম ১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্ত থেকে বিরোধীদের উপর নিপীড়ন শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর বিরোধীদের ৭২ ঘন্টা অবরোধের প্রথম দিনেই বেলা ১২টার দিকে মেইন বাসস্ট্যান্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় উপজেলা হরিন্দিয়া গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে শিবির কর্মী ইসরাইল হোসেন। এই হত্যাকান্ডেরোো পর পুলিশের উপর হামলা, বোমা বিস্ফোরণের মিথ্যা অভিযোগ এনে ৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয় পুলিশের গুলিতে নিহত ইসরাইল হোসেনের পিতা শহিদুল ইসলামকে।
২০১৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে বের হবার সময় উপজেলা নির্বাচন অফিসের সামনে থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে থানার এস আই মিজান, এস আই সৈয়দ আলীসহ ৬ থেকে ৭জন পুলিশ সদস্য তাদের পিকাপে জামায়াত নেতা এনামুল হক মাস্টারকে তুলে নিয়ে যায়। ওই দিনগত গভীর রাতে (২৬শে জানুয়ারি ২০১৪) কোটচাঁদপুর পৌর শহরের নওদা গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পিছনে এনামুল হক মাস্টারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি উপজেলার মুরুটিয়া-বলরাম-পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন।
ওই সময় পুলিশ দাবি করেছিল এনামুল হক মাস্টারকে নিয়ে অভিযানে গেলে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে তিনি নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর কোটচাঁদপুর-মহেশপুরে আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। যে কারণে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিরোধী শিবির যাতে একত্রিত হয়ে প্রতিবাদের কোন সুযোগ না পায় সে কারণে ২৭ জানুয়ারি জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি ও গ্রেপ্তার শুরু করে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত নেতাদের ঘাড়ে চাপানো হতো নতুন নতুন গায়েবী মামলা। নিহত জামায়াত নেতার পরিবারের দাবি পুলিশ প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যেয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে। সে সময় তারা পুলিশের ভয়ে মামলা করতে সাহস করেনি।এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েও পুলিশ ক্ষ্যান্ত হয়নি।
২০১৪ সালের ১৮ই এপ্রিল সকালে উপজেলার বলাবাড়িয়া গ্রামের জামাত নেতা এলাঙ্গী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হাফেজ আবুল কালামকে বাড়ি থেকে সাদা পোশাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে আসে কোটচাঁদপুর থানা পুলিশ। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার গুড়পাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে। ঐদিন রাতের কোন এক সময় পুলিশ সেখান থেকে সরিয়ে লোক চক্ষুর আড়ালে নিয়ে রাখে জামায়াত নেতা হাফেজ আবুল কালামকে। দুদিন আবুল কালামের পরিবারের লোকজন ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন থানায় ও পুলিশ ফাঁড়িতে গেলেও তার হদিস পায়না তারা। ২১শে এপ্রিল খুব সকালে খবর আসে আবুল কালামের গুলিবিদ্ধ লাশ ঝিনাইদহ সদর থানার বাজার গোপালপুর এলাকার মামুন-সিয়া গ্রামের বকুলতলা মাঠে পড়ে আছে। আবুল কালামের বুকে ও গলায় গুলি করা হয়। হত্যার আগে আবুল কালামের উপর প্রচন্ড নির্যাতন করা হয়েছিল। যা তার শরীরের অগণিত আঘাতের চিহ্ন দেখে লাশ দেখতে আসা সবাই বুঝতে পারেন। পুলিশ এই হত্যাকা-টি সন্ত্রাসী কর্তৃক অপহরণের পর হত্যা বলে চালিয়ে দেয়। অথচ কোটচাঁদপুর থানার এস আই মিজান, এ এস আই শিবু দত্ত সহ ৫ থেকে ৬ জন পুলিশ সদস্য দিনের আলোতে হাফেজ আবুল কালামকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসে। এই তিন হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ এক যুগেও চাইতে পারেনি ভুক্তভোগী পরিবার।
গত বছর ৫ ই আগস্ট ( ২০২৪) ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর ভুক্তভোগী পরিবাররা ঝিনাইদহের সাবেক পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন, কোটচাঁদপুর সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, কোটচাঁদপুর থানার সাবেক এসআই মিজান, এসআই সৈয়দ আলী, এ এস আই শিবু দত্তসহ আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকজন নেতা কর্মীকে আসামি করে পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশের কার সাজির কারণে ওই মামলাগুলো আজও আলোর মুখ দেখতে পারেনি।
উল্লেখ্য, এ সকল অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সাবেক পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন ২০১৬ সালে সাতক্ষীরায় বদলী হন। সে সময় ১২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে গায়েব করে দেন তিনি। এ সংক্রান্ত বিয়য়ে তিনি চাকুরণচ্যুত হন, অন্য পুলিশ সদস্যরা এখনো চাকুরীতে বহাল রয়েছেন।
office@ukantho.com