প্রিয় ঝিনাইদহ
সংসার সামলে ১৪ বছর পর পড়াশোনায় ফেরা, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেলেন রীতি
উচ্চকন্ঠ 02-Nov-2026 12
বসির আহমেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। পেরিয়ে গেছে ১৪ বছর। তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও স্বপ্নকে কখনো বিসর্জন দেননি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার গৃহবধূ রীতি খাতুন (৩০)। স্বামীর অনুপ্রেরণা ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরে এসেছেন তিনি। এবার বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রীতি। তাঁর এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
রীতি খাতুন ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের আব্দুল আলিম মন্ডল বাবুর স্ত্রী। তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন রীতি। পরের বছর ২০১১ সালে বিয়ের পর সংসারজীবনে প্রবেশ করেন তিনি। সংসারের ব্যস্ততা ও নানা দায়িত্বের কারণে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। বর্তমানে ১১ বছর বয়সী এক মেয়ের মা রীতি দীর্ঘদিন সংসারের দায়িত্ব পালন করলেও মনের মধ্যে লালন করেছেন আবারও পড়াশোনা শুরু করার স্বপ্ন।
সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০২৪ সালে স্বামীর উৎসাহে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ভর্তি হন ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। দীর্ঘ বিরতির পর শ্রেণিকক্ষে ফিরে নতুন করে পড়াশোনার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তার ওপর ছিল সংসারের কাজ ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব। সবকিছু সামলে পড়াশোনার জন্য সময় বের করাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এর পাশাপাশি সামাজিকভাবেও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। প্রতিবেশীদের উপহাস ও নানা নেতিবাচক মন্তব্য উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন রীতি। স্বামীর সহযোগিতা, শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে নিয়েছেন পড়াশোনা। অবশেষে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রীতি খাতুন বলেন, ‘স্বামীর সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা ছাড়া এই বয়সে নতুন করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য কঠিন হতো। সংসারের সব কাজ সামলে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হয়েছে। শিক্ষকদের সহযোগিতা ও পরামর্শও অনেক কাজে এসেছে। সবার সহযোগিতায় আজ এই ফলাফল অর্জন করতে পেরেছি।’
রীতির স্বামী আব্দুল আলিম মন্ডল বাবু বলেন, স্ত্রীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁকে কলেজে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন তিনি। তাঁর স্ত্রী যে ভালো ফলাফল করবেন, তা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। রীতির এই অর্জনে পরিবারের সবাই আনন্দিত।
ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সায়ফুল ইসলাম বলেন, ‘সংসারের নানা দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রীতির এই অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তাঁর চেষ্টা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় অন্যদেরও নতুন করে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলবে। রীতির এই সাফল্য প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই শিক্ষাজীবনে ফিরে আসা সম্ভব।’
office@ukantho.com