প্রিয় ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহে বাড়ছে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু
উচ্চকন্ঠ 21-May-2026 14
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ঝিনাইদহের মাঠে-ঘাটে। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি আর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ। এরপরই আসে কান্নার খবর। কখনও পেঁয়াজক্ষেত থেকে, কখনও ধানের জমি থেকে, আবার কখনও গরু আনতে যাওয়া কৃষকের নিথর দেহ পড়ে থাকে মাঠের মাঝখানে।
প্রতি বছরই বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। অথচ তাদের নিরাপত্তায় নেই কোনো কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা। মাঠে নেই বজ্র নিরোধক দ-, নেই জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র। এমনকি পরিকল্পিতভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগও চোখে পড়ে না। ফলে জীবিকার তাগিদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই খোলা মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
কালবৈশাখী মৌসুম শুরু হলেই ঝিনাইদহে বাড়তে থাকে বজ্রপাত ও প্রাণহানির ঘটনা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় বজ্রপাতে মারা গেছেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। এর আগে ২০২৫ সালে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। নিহতদের অধিকাংশই কৃষক বা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ।
গত ২৮ মার্চ শৈলকুপা উপজেলার খড়িবাড়িয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পেঁয়াজ গোছাতে গিয়ে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দুই কৃষক। আহত হন আরও চারজন। পরদিন ২৯ মার্চ একই উপজেলায় বজ্রপাতে আহত হন আরও তিনজন। পরে ১৬ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারান এক গৃহবধূ।
সবশেষ সোমবার (১৮ মে) বিকেলে সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মায়াধরপুর এবং শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামে বজ্রপাতে একজন কৃষক ও একজন গৃহবধূ নিহত হন। নিহতরা হলেন, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার নফরকান্দি গ্রামের দিনমজুর আসাদুল ইসলাম (৪০) এবং শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামের আন্না খাতুন (৪৫)।
জানা গেছে, আসাদুল ইসলাম সদর উপজেলার মায়াধরপুর গ্রামের একটি মাঠে ধান কাটার কাজ করছিলেন। বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে বাড়ির দিকে ফেরার পথে বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, বিকেলে ঝড় শুরু হলে বাড়ির পাশের আমবাগানে আম কুড়াতে যান আন্না খাতুন। এ সময় বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। একই দিনে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ধোপাঘাটা গোবিন্দপুর, দৌগাছি, নারিকেলবাড়িয়া এবং শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে নারীসহ আরও ১০ জন আহত হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর এমন দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
খড়িবাড়িয়া গ্রামের কৃষক সুশীল বিশ্বাস, যিনি বজ্রপাতে নিহত সমীর বিশ্বাসের বাবা, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সেদিন আকাশে মেঘ দেখে সবাই তাড়াহুড়া করে পেঁয়াজ তুলছিল। বৃষ্টি নামলে সব নষ্ট হয়ে যেত। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। পরে দেখি আমার ছেলে মাটিতে পড়ে আছে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সব শেষ। মাঠে যদি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো আজ আমার ছেলে বেঁচে থাকত।”
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। মাঠে না গেলে সংসার চলবে না। মেঘ জমলে ভয় লাগে, কিন্তু ফসল ফেলে চলে আসাও সম্ভব না। একদিনের বৃষ্টি মানেই কয়েক মাসের কষ্ট শেষ হয়ে যাওয়া। তাই জীবন হাতে নিয়েই কাজ করতে হয়।”
কৃষক লালন মিয়া বলেন, “প্রতিবছর মানুষ মারা যায়, কিছুদিন আলোচনা হয়, পরে সব থেমে যায়। মাঠে যদি বজ্র নিরোধক শেল্টার আর তালগাছ থাকত, তাহলে অন্তত আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পেতাম।”
শুধু শৈলকুপা নয়, সদর, মহেশপুর, হরিণাকুন্ডু, কালীগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠেও একই চিত্র। কোথাও নেই বজ্রপাত প্রতিরোধে আধুনিক ব্যবস্থা। অনেক কৃষক জানান, বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, সে বিষয়েও তাদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
সচেতন নাগরিক মতিয়ার রহমান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাড়েনি। বজ্রপাত এখন গ্রামাঞ্চলের নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। কৃষিনির্ভর এ জেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রাণহানি কমানো সম্ভব নয়। এজন্য মাঠভিত্তিক বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ, পর্যাপ্ত তালগাছ রোপণ, আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।”
অভিযোগ রয়েছে, জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পক্ষ থেকে বজ্রপাত নিরোধে কার্যকর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০২৫ সাল এবং চলতি বছরেও জেলার কোথাও বজ্র নিরোধক দন্ড স্থাপন, বজ্র নিরোধক শেল্টার নির্মাণ কিংবা বড় পরিসরে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকের জীবন রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসার নূর-এ-নবী বলেন, “খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই কৃষিজমির আশপাশে বজ্র নিরোধক শেল্টার ও বজ্র নিরোধক দ- স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ তালবীজ রোপণ করা হয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেই গাছের আর অস্তিত্ব নেই।”
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, “বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় দ্রুত তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় কিছু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।”
office@ukantho.com