প্রিয় ঝিনাইদহ
পিঠে বড়শি বিঁধে শুন্যে ঘুরানো হলো ৭ সন্ন্যাসীকে, ঝিনাইদহের চড়ক মেলায় দর্শনার্থীদের ঢল
উচ্চকন্ঠ 17-Apr-2026 47
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: বড়শিতে গাথা জ্যান্ত তাজা মানুষ| চড়ক গাছের এক মাথায় ঝুলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট শুন্যে ঘুরাতে ঘুরাতে সন্ন্যাসী অসিত কর্মকার মনা ছুড়ে দিচ্ছিলেন বাতাসা| মনার মত একে একে ৭ সন্ন্যাসীর পিঠে বড়শী বিধে শুন্যে ঘুরে পালন করলেন শিব পুজার অংশ চড়ক উৎসব| গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে গাঁ শিউরে উঠা এ চড়ক উৎসব দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুসহ সব বয়ষের মানুষ| ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর বাজারের বকুলতলায় প্রতি বছরের ন্যায় ১৬ এপৃল বৃহস্পতিবার বিকালে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহি এ চড়ক উৎসব|
স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় ২০০ বছর আগে অবিভক্ত ইনডিয়ার বনগার জজ সাহেব ননি বাবু এ মেলার প্রচলন করেন| তিনি ফতেপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন বলেও জানান তারা| এরপর থেকে চলে আসা এ মেলাটি স্থানীয় মানুষের কাছে সাংস্কৃতির ঐতিহ্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত দলিল হয়ে ফিরে আসে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে|
মহেশপুর শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত ফতেপুরের বকুলতলা বাজার| এ গ্রামের বকুলতলা বাজারে ভারতীয় পঞ্জিকা মতে ২ ˆবশাখ অনুষ্ঠিত হয় চড়ক উৎসবটি| হিন্দু ধর্মাবলীরা নানা উৎসব আয়োজনে এ পুজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকেন| প্রতি বছর এই পুজার মুল আকর্ষণ সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শিবিদ্ধ করে শুন্যে ঘোরা| এবছর ৭ জন সন্ন্যাসী বড়শি (বান) ফুড়িয়ে শুন্যে ঘুরলেন|
স্থানীয়রা জানায়, দুইশত বছর ধরে চলে আসছে এ চড়ক পুজা| আর এ পুজাকে ঘিরে বকুলতলা বাজারে দুইদিন ধরে চলে লোকজ গ্রামীণ মেলা| যুগ যুগ ধরে মেলাটি ইতিহাস আর ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের কাছে|
ফতেপুরের এ চড়ক মেলার মুল আকর্ষণ বড়শিবিদ্ধ হয়ে শুন্যে ঘোরানো (স্থানীয় ভাষায় বলা হয় বান ফুড়ানো)| এ দৃশ্য দেখতে এবং মেলায় কেনা কাটা করতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাজির হয় হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু| দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গনে| বিকেলের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা| চারিদিকে সাজ সাজ রব| পুরো এলাকা জুড়ে উৎসবের আমেজ| ঠিক বিকাল সাড়ে ৪ টা বাজার সাথে সাথে ৯ সন্ন্যাসী অসিত কর্মকার মনা, বিপ্লব কর্মকার, ভিম হালদার, বাসুদেব কুমার, অধির কুমার, মহাদেব হালদার, সাধন বাবু রায়, আনন্দ কুমার বিশ্বাস ফতেপুর বাওড়ে স্নান করেন| এরপর ৯ সন্ন্যাসী মাটির কলসে জল ভরে মাথায় নিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গনের চড়ক গাছের গোড়ায়| ঠিক ৪ টা ৩০ মিনিটে প্রথমে অসিত কর্মকার মনার পিঠে দুটি বড়শী বিদ্ধ করেন| এরপর তাকে ঝুলিয়ে দেন চড়ক গাছে| অপর গাছের অপর প্রান্তে থাকা কপিকলের বাঁশ জোরে জোরে ঘোরাতে থাকেন ২০ থেকে ২৫ জন যুবক| চড়ক গাছে লটকে দেওয়ার সাথে সাথে কিছু মহিলা তাদের এক দেড় বছরের শিশু সন্তানকে তুলে দেন সন্ন্যাসীদের কোলে| শিশুদের নিয়েই শুন্যে ঘুরতে থাকেন সন্ন্যাসীরা| এ অবস্থায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাতাসা মিষ্টি|
এভাবেই বড়শীতে বিধে ৪ থেকে ৫ পাক শুন্যে ঘুরে নেমে আসেন অসিত কর্মকার| এ নিয়ে ২৩ বার চড়ক গাছে চড়লেন বলে অসিত কর্মকার জানান| তিনি জানান সবাই চড়ক গাছে উঠতে পারে না| এতে উঠতে গেলে মনের অনেক সাহস লাগে| মনার পর একে একে বান ফোড়ালেন বিপ্লব কুমার, বাসুদেব কুমার, মহাদেব কুমার ও অধির কুমার সহ সাতজন| এবছর ৯ জন সন্নাসী তাকলেও সাতজন বান ফুড়িয়ে শুন্যে ঘোরেন|
স্থানীয়রা জানান, আগে শুধুমাত্র পিঠে বান ফুড়িয়েই ঝুলিয়ে দেওয়া হতো চড়ক গাছে| আর সে অবস্থাতেই ঘোরানো হতো| প্রায় ১১৫ বছর পূর্বে এক সন্ন্যাসীর পিঠের চামড়া ছিড়ে পড়ে আহত হওয়ার কারণে বড়শির উপর এখন গামছা পেচিয়ে দেওয়া হয়|
সন্ন্যাসী বিপ্লব কর্মকার জানান, শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টির জন্যই তারা প্রতি বছর চড়ক গাছে চড়ে থাকেন| শরীরে বড়শী বিধার ফলে বড় ধরণের ক্ষতের সৃষ্টি হলেও সামান্যই রক্ত বের হয়| কিন্তু এর জন্য কোন ঔষধ লাগে না| চড়ক গাছ থেকে নামিয়ে গাছের গোড়ায় থাকা সিঁদুর টিপে দিলেই হয়|
সন্ন্যাসীরা জানান, পূর্ব পুরুষদের কাছে শুনেছেন দুইশত বছর আগে এখানে চড়ক পুজা শুরু হয়| আগে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে এ পুজার আয়োজন করা হতো| সেই স্থানে সরকার আশ্রয়ন প্রকল্প গড়ে তোলার কারনে এখন ফতেপুর বকুল তলার বাজারে চড়ক পুজা হয়|
এ মেলাই মিষ্টির দোকানী সুখদেব কুমার ১২ থেকে ১৫ রকমের মিষ্টি সাজিয়ে বিক্রি করছেন| এবার ১৭ বারের মত মেলায় আসলেও বেচাকেনা বেশ ভালোই হচ্ছে বলে জানান| মেলার আরেক প্রান্তে কথা হলো সাখা সিঁদুর বিক্রেতা প্রকাশ বিশ্বাসের সাথে| তার ভাষ্য প্রতিবছরই আমি এ মেলায় বললেন আসি, এবার বিক্রি ভালো হয়েছে বলে যোগ করেন|
পুজা ও মেলা কমিটির সভাপতি সাধন কুমার ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক সুবোল কর্মকার জানান, চড়ক পুজা মুলত শিব পুজারই অংশ| নানা আনুষ্ঠানিকতায় তা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে, সাথে দেশীয় লোকজ মেলা বসে| উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী এসে যোগ দেন| কত বছর ধরে মেলাটি চলে আসছে তা বলতে পারেননি তারা| তবে, দির্ঘ বছর ধরে চলে আসা মেলাটি এখন মানুষের কাছে সাংস্কৃতির ঐতিহ্য আর প্রাণের মেলায় পরিনত হয়েছে| প্রায় ২০০ বছর আগে অবিভক্ত ইনডিয়ার বনগার জজ সাহেব ননি বাবু এ মেলার প্রচলন করেন| সে থেকেই এ মেলা চলে আসছে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন হয়ে|
office@ukantho.com