প্রিয় ঝিনাইদহ
দশম শ্রেণির ছাত্রী নির্জনাকে খুন করেন নিজের বাবা-মা, মায়ের স্বীকারোক্তি
উচ্চকন্ঠ 11-Jul-2026 25
এফএনএস: সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী আরফান হোসেন নির্জনাকে (১৭) হত্যা করেছেন তার মা ও বাবা। হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা। পারিবারিক কলহের জেরে মেয়েকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মা সীমা আক্তার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় অভিযুক্ত নিহতের বাবা মোহাম্মদ আলী হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, গত ৮ জুলাই রাত প্রায় ৯টার দিকে সদর থানা এলাকার একটি আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়ক থেকে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে। পিবিআই, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রচার এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। তদন্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। নিহত আরফান হোসেন নির্জনা সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা, সে মোহাম্মদ আলী হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সীমা দম্পতির একমাত্র সন্তান। কেএমপি কমিশনার জানান, নিহতের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রথমদিকে তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সীমা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। এরপর ১০ জুলাই অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে সদর থানা পুলিশ। মেয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং একাধিকবার বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন মা-মেয়ের মধ্যে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সীমা মেয়েকে মারধর করেন। পরে পাশের কক্ষ থেকে এসে বাবা আকাশ কাঠের একটি বাটা দিয়ে আঘাত করলে সেটি কিশোরীর মাথায় লাগে। এতে গুরুতর আহত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, মৃত্যুর পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে লাশটি প্রথমে কাপড়ে মুড়িয়ে পরে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে সদর থানা এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রাখা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সীমা স্বেচ্ছায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের বাবা আকাশকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তার অবস্থান শনাক্তে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে তদন্তে নিহতের বাবা-মায়ের মাদক সেবনের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিষয়টি এখনও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পুলিশ জানায়, পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া এলাকার এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে করায় নির্জনার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তার মা-বাবা। গত ২১ এপ্রিল নির্জনা স্বেচ্ছায় তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে বিয়ে করেন। এর ১৭ দিন পর তাকে বুঝিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। ঘটনার দিন সকালেও মেয়েটি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলে তাকে আবারও বুঝিয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু বিকেলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, নির্জনা অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন পালিয়ে এক বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করে। কিছুদিন সেখানে থাকার পর আবার বাড়িতে ফিরে আসে। পরে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটে। সম্প্রতি রনি নামের যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যায়। সেখানে তিন দিন থাকার পর বাড়িতে ফোন করে জানায়, সে রনিকে বিয়ে করেছে। এরপর সেখান থেকেও কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে আসে। এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলছিল। এদিকে, একমাত্র সন্তান নির্জনার মৃত্যুর পর ঘাতক পিতা আকাশ ও মা সীমা চরম অস্থির হয়ে পড়েন। লোকলজ্জা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে তারা তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতরেই নির্জনার মরদেহের হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ফেলেন। এরপর রাতের আঁধারে সুবিধাজনক সময়ে সেই বস্তাবন্দি লাশ নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে দিয়ে দুজনই পালিয়ে যান। লাশ বস্তাবন্দি করা ও গুমের চেষ্টার পুরো প্রক্রিয়ায় ঘাতক স্বামীকে সরাসরি সহযোগিতা করেন মা সীমা। ঘটনার পরপরই পরিচয় শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পিবিআই, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় তদন্ত চালানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতের ছবি প্রকাশ, বেতার বার্তা প্রচার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ১০ জুলাই খুলনা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। বৃহস্পতিবার মর্গে গিয়ে সীমা সাংবাদিকদের কাছে মেয়ের বিয়ে ও চিঠি লিখে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে পুরো দায় নির্জনার সাবেক স্বামীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। সীমা জানান, চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নির্জনা তেরখাদা উপজেলার পালেরহাট আজগড়া গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। ১৭ দিন পর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও ওই যুবক নির্জনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তার দাবি, রনিই কৌশলে নির্জনাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে গেছে। তিনি আরও জানান, এর আগে ফকিরহাট উপজেলার বারইপাড়া এলাকার আরেক যুবকের সঙ্গেও নির্জনার বিয়ে হয়েছিল। তবে সেখানে মাত্র একদিন থাকার পর সে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। মায়ের দাবি অনুযায়ী, বুধবার সকালে নির্জনা বাড়ি থেকে বের হলে তাকে ডেকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু দুপুরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকাকালে সবার অজান্তে সে আবার বের হয়ে যায়। এর আগে নির্জনা একটি চিঠিও লিখেছিল, যেখানে তাকে খোঁজাখুঁজি না করার কথা উল্লেখ ছিল।
office@ukantho.com