প্রিয় ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের প্রকৃতিতে ফিরেছে কলকাকলি, পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে গ্রামবাংলা
উচ্চকন্ঠ 14-May-2026 39
বসির আহাম্মেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের সূর্য ওঠার আগেই কিচিরমিচির শব্দে এখন ঘুম ভাঙে ঝিনাইদহের মানুষের। শুধু ভোর নয়Ñসকাল, দুপুর কিংবা নিঝুম রাতেও ডানা ঝাপটানো নানা প্রজাতির পাখির ডাকে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। এক সময় যেসব পাখি বিলুপ্তপ্রায় বলে মনে হয়েছিল, গত দুই দশকে সেগুলোই আবার ফিরে আসছে গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন কার্যকর হওয়া এবং পাখি শিকার নিষিদ্ধের ফলে দেশের গ্রামাঞ্চল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে পাখিদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে।
ঝিনাইদহের সাবেক জেলা বন কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দীন মুকুল জানান, এক সময় শিকারিদের দৌরাত্ম্য ও বন-জঙ্গল উজাড় হওয়ার কারণে বহু প্রজাতির পাখি হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতনতা, স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং প্রশাসনের নজরদারি পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে।
তিনি বলেন, এখন গ্রামের ঝোপঝাড়, পুকুরপাড় ও পুরনো গাছগুলোতে নিরাপদে বাসা বাঁধছে অসংখ্য পাখি। গ্রামাঞ্চলে গেলে চোখে পড়ে দোয়েল, চড়–ই, শালিক, বুলবুলি, টুনটুনি, ঘুঘু, হরিয়াল, বক, শামখোল, গাংচিল, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ডাহুক, কোকিল, ফিঙে, শ্যামা, বেনেবউ, কাঠঠোকরা, লক্ষ্মীপেঁচা ও হুতোমপেঁচাসহ নানা প্রজাতির পাখি। বিশেষ করে বিল ও নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে জলচর পাখিদের ঝাঁক আর ডানা মেলার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের চিত্র।
ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আতিকুজ্জামান বলেন, কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে পাখিদের অবাধ বিচরণ শুধু প্রকৃতির ভারসাম্যই রক্ষা করছে না, মানুষের মনোজগতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভোরবেলার দোয়েলের শিষ কিংবা দুপুরের ঘুঘুর ডাক গ্রামীণ জীবনে এনে দিচ্ছে প্রশান্তি।
স্থানীয় বাসিন্দা রামিম হাসান বলেন,
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, যান্ত্রিক সভ্যতার এই ব্যস্ত সময়ে পাখির কলতান যেন এক ধরনের প্রাকৃতিক থেরাপি। প্রকৃতির এই সুর মানুষের মন ও মননে এনে দিচ্ছে স্বস্তি ও নতুন উদ্দীপনা।
পরিবেশবিদ জহির রায়হান মনে করেন, দেশের গ্রামগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ‘পাখি গ্রাম’ বা অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য বিশ্বদরবারে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন কার্যকর হওয়ার পর গ্রামবাংলার প্রকৃতি আবার ফিরে পেয়েছে তার হারানো সৌন্দর্য। এখন হিজল-তমালের ডালে, বিস্তীর্ণ বিলের জলে আর সবুজ ঝোপঝাড়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় শত শত পাখি।
গ্রামের গৃহবধূ রাজিয়া বেগম জানান, শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামে এলে পাখির ডাক আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মনকে অন্যরকম শান্তি দেয়। তার ভাষায়, “পাখিদের এই ফিরে আসা যেন প্রকৃতির নতুন করে বেঁচে ওঠা। তাদের ডানার শব্দ আর কলতানে গ্রামের পরিবেশ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।”
গ্রামের কৃষক রমজান আলী জানান,
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, পাখির এই প্রত্যাবর্তন শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, মানুষের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির জন্যও এক আশার বার্তা। যুগে যুগে বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকা পাখিরা আবারও গ্রামবাংলার আকাশে ফিরিয়ে আনছে জীবনের সুর, সবুজের সৌন্দর্য আর প্রকৃতির চিরচেনা মুগ্ধতা।
office@ukantho.com